শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার একটি সেতুর নিচে খালের ভেতর প্লাস্টিকের ড্রামে ভাসমান অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের কিনারা করে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করেছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সংস্থাটির দাবি, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে ওই নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে শেরপুর জেলা শহরের পুরাতন গরুহাটি এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির শেরপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত।
তদন্তে জানা গেছে, নিহত নারীর নাম ঝিনুক আক্তার (২৬)। তিনি গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকার শাকিল মিয়ার মেয়ে।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন— পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিঘলগ্রাম এলাকার আ. রশিদের ছেলে নূর ইসলাম ওরফে বাবু (৪৪), জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বাঘমারা শিশুয়া গ্রামের আলাউদ্দিনের ছেলে সজল (৪৪), শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা এলাকার আইবালীর ছেলে নূর মোহাম্মদ ওরফে গোসা ওরফে বুশা (৪৪) এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার কুশিয়ারা এলাকার নায়েব আলী ভূঁইয়ার মেয়ে মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমা (৪৪)।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর সকালে শ্রীবরদী উপজেলার কুড়িকাহনিয়া এলাকায় সেতুর নিচের খালে একটি বড় নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে অবহিত করেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ড্রামটি খুলে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত এবং বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়। খবর পেয়েই পিবিআই তদন্তে নামে এবং একপর্যায়ে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়।
ঘটনার পর ২৩ অক্টোবর নিহতের ফুপু শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে শ্রীবরদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ঝিনুকের স্বামী সাইফুল ইসলাম মুন্নাসহ চার-পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলার পর থেকেই পিবিআই ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সংগৃহীত আলামত বিশ্লেষণের পর ২৯ অক্টোবর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিঘলগ্রাম থেকে নূর ইসলাম ওরফে বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরদিন ঢাকার উত্তরখান এলাকা থেকে সজলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ১ নভেম্বর একই এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদ ওরফে গোসা ওরফে বুশা এবং মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ঝিনুক টঙ্গীর একটি পার্লারে কর্মরত ছিলেন। গত ২১ অক্টোবর দুপুরে তিনি মোবাইল ফোনে সজল ও নূর ইসলাম ওরফে বাবুর সঙ্গে কথা বলে ঢাকার উত্তরখানের কবিরশাহ মাজার এলাকায় যান। সেখান থেকে মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমা এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে বুশা তাকে দক্ষিণখানের মৌশাইর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, ওই ভাড়া বাসায় ঝিনুককে আরও কয়েকজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার সময় তাকে ১২০০ টাকা দেওয়া হলে তিনি আরও টাকার দাবি জানান। এই বিষয় নিয়ে ফাতেমার সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ফাতেমা ঘরে থাকা বঁটি দিয়ে ঝিনুককে কোপান। অন্য আসামিরা তার হাত-পা চেপে ধরে এবং গলায় গামছা পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর মরদেহটি একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে একটি অজ্ঞাত গাড়িতে করে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে শেরপুরের শ্রীবরদীর ওই খালে ফেলে দেওয়া হয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত নূর ইসলাম ওরফে বাবু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
পিবিআই শেরপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, “এটি ছিল একটি ক্লুলেস হত্যা মামলা। ঘটনার পর থেকে পিবিআইয়ের সদস্যরা সমন্বিতভাবে তদন্ত চালিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। তদন্তে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে উঠে এসেছে।”