দীর্ঘ আট বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের চা-শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ২৮ নভেম্বর পঞ্চায়েত, ভ্যালি এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী ৫ নভেম্বর থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চা-শ্রমিকদের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, এই নির্বাচনের মাধ্যমে এমন এক যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যারা মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন প্রদান, উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালে। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ তিন বছর হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পুরোনো নেতৃত্ব, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। শ্রমিকদের অভিযোগ, এই দীর্ঘ ব্যবধানের কারণে তাদের দাবি-দাওয়া যথাযথভাবে তুলে ধরা, অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং সংগঠনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
চা-শ্রমিকদের এই সংগঠনটি মূলত তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়—বাগান পর্যায়ের পঞ্চায়েত, আঞ্চলিক পর্যায়ের ভ্যালি এবং কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন। এই কমিটিগুলোর প্রধান দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করা, তাদের দাবি-দাওয়া উত্থাপন করা, কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা। তবে দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় এসব কমিটির নেতৃত্বের বৈধতা, কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা বাংলাদেশ চা-কন্যা সংসদের সভাপতি খাইরুন আক্তার বলেন, “আট বছর নির্বাচন না হওয়ায় কমিটিগুলোতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কোথাও ভারপ্রাপ্ত বা অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে। অনেক বাগানে শ্রমিকদের নিয়মিত পারিশ্রমিক পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে।” তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, নির্বাচন হলে নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালেই নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে শ্রম অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে করোনা মহামারীর প্রভাব এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও অর্থের সংস্থান নিয়ে জটিলতা ছিল। সরকার এই ব্যয় বহন করতে রাজি না হওয়ায় নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়।
নির্বাচনের বিস্তারিত তপশিল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা যাবে। একই সময়ে ৫, ৬ ও ৯ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
১০ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এবং ১১ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে প্যানেলভিত্তিক প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ১২ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল ও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ নভেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারবেন। এরপর ১৪ নভেম্বর বেলা ১১টায় প্যানেলভিত্তিক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।
একই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এবং ১৫ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। তপশিল অনুযায়ী, ২৮ নভেম্বর শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে এবং ভোটগ্রহণ শেষ হলে ভোট গণনা করা হবে।
পঞ্চায়েত কমিটি, ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের বিভিন্ন পদে প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তপশিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্ধারিত প্যানেলের বাইরে কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হবে না।
নির্বাচনে পঞ্চায়েত কমিটির জন্য ঘোড়া, উড়োজাহাজ, জেলাপাড়ি, চিত্রবিচিত্র, চিংড়ি, মাইক, চিরুনি, ময়ূর, ঘণ্টা ও আলমারি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। ভ্যালি কার্যকরী পরিষদের জন্য রাখা হয়েছে আম, সেলাই মেশিন, টেলিফোন, টর্চলাইট, টেবিল ও তালা-চাবি প্রতীক। কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সভাপতি পদের জন্য আনারস, জাহাজ, কলস, কাপ-পিরিচ, বই ও বেলগাছ এবং সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য মোরগ, ফুটবল, টেবিল, হরিণ, ঘুড়ি ও পানির ট্যাপ প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইউনিয়ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে দেশের পাঁচ জেলার ২১টি উপজেলার ২৩১টি চা-বাগানের পঞ্চায়েত পর্যায়ে ছয় শতাধিক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। প্রায় ৯৮ হাজার শ্রমিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিভিন্ন পদে সাড়ে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা গেছে। একই দিনে বাগান পঞ্চায়েতের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সাতটি ভ্যালির নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের অধীনে দেশে ১৬৭টি মূল ও ৬৪টি ফাঁড়ি চা-বাগান রয়েছে। প্রতিটি পঞ্চায়েতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ সদস্যের কমিটি নির্বাচিত হবে। লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম—এই সাতটি ভ্যালির মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করা হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পৃথক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
নির্বাচন পরিচালনার বিষয়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল জানান, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পঞ্চায়েতে একটি করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ভোটগ্রহণ স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলায় মূল ও ফাঁড়ি মিলিয়ে ৪১টি চা-বাগান রয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর এসব বাগানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রার্থী নিয়ে আলোচনা এবং পছন্দের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শ্রমিকদের কাছে এই নির্বাচন শুধু কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি বড় সুযোগ।
মাধবপুরের দারাগাঁও চা-বাগানের শ্রমিক রনি গোয়ালা জানান, “তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন এবং তাদের দাবি আদায়ে কাজ করবেন।” মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত বেতন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শ্রমিকদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। নতুন নেতৃত্ব এসব বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করবে, এটাই তাদের চাওয়া।
প্রবীণ চা-শ্রমিক অনীল কৈরীর প্রত্যাশাও একই রকম। তার মতে, দীর্ঘদিন পর শ্রমিকেরা নিজেদের পছন্দের নেতা নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচিত নেতারা যেন শুধু ভোটের সময় শ্রমিকদের কাছে না যান, বরং সারা বছর তাদের পাশে থেকে সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখেন।
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে দেশের চা-শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। ইউনিয়ন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, এর সদস্যসংখ্যা প্রায় এক লাখ। এত বড় শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সংগঠনে দীর্ঘদিন নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আসন্ন নির্বাচন সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে শুধু নির্বাচন সম্পন্ন করলেই শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচিত নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরতে পারবে, বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কতটা অগ্রাধিকার দেবে, সেটিই হবে তাদের জন্য বড় পরীক্ষা।
চা-শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব মজুরি বৃদ্ধির দাবি, নিয়মিত পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসুবিধা এবং শ্রমিক পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে। একই সঙ্গে বাগান পর্যায়ে বিরোধ নিরসন, সাংগঠনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিকদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করবে।
দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষা শেষে ২৮ নভেম্বরের নির্বাচন তাই চা-শ্রমিকদের কাছে শুধু নেতৃত্ব নির্বাচনের দিন নয়, বরং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার প্রত্যাশা। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা নেতৃত্ব শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারে।