গণিতের বিশাল জগতে সবচেয়ে রহস্যময় এবং কৌতূহল উদ্রেককারী চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মৌলিক সংখ্যা। ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭… এভাবে অনন্তকাল ধরে চলা এই সংখ্যাগুলোর কোনো সহজ বা সাধারণ ধারা আপাতদৃষ্টিতে চোখে পড়ে না। তবে গণিতবিদেরা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে এদের ভেতরে কিছু চমৎকার ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম খুঁজে পেয়েছেন। তেমনই একটি চমকপ্রদ নিয়ম হলো: ২ আর ৩ বাদে যেকোনো মৌলিক সংখ্যাকে 6k + 1 অথবা 6k-1 আকারে লেখা যায়, যেখানে k একটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা।
প্রথমবার শুনলে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু ভাগশেষের একটি সহজ যুক্তির মাধ্যমেই এটি প্রমাণ করা সম্ভব।
∎ ৬ দিয়ে ভাগ করলে যা হয়
যেকোনো পূর্ণসংখ্যাকে ৬ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হতে পারে ০, ১, ২, ৩, ৪ অথবা ৫। সেই হিসেবে পৃথিবীর সব পূর্ণসংখ্যাকে ঠিক এই ছয়টি রূপের যেকোনো একটিতে ফেলা যায়:
6k, 6k + 1, 6k + 2, 6k + 3, 6k + 4, 6k + 5
এখন বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, এর মধ্যে কোনগুলো মৌলিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে:
∎ 6k: এটি ৬-এর গুণিতক (যেহেতু ৬ = ২ × ৩), তাই এটি কখনোই মৌলিক হতে পারে না।
∎ 6k + 2 = 2(3k + 1): এই সংখ্যাটি সব সময় জোড়, তাই ২ ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে এটি মৌলিক নয়।
∎ 6k + 3 = 3(2k + 1): এই সংখ্যাটি সব সময় ৩ দিয়ে বিভাজ্য, তাই ৩ ছাড়া এটি মৌলিক নয়।
∎ 6k + 4 = 2(3k + 2): এটিও সব সময় জোড় সংখ্যা, ফলে এটি মৌলিক নয়।
বিশ্লেষণের পর বাকি থাকে শুধু 6k + 1 আর 6k + 5। উল্লেখ্য যে, 6k + 5 = 6(k + 1) -1, অর্থাৎ এটিকে 6k-1 আকারেও লেখা সম্ভব (এখানে k-এর পরিবর্তে k + 1 ধরে)। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, ৩-এর চেয়ে বড় প্রতিটি মৌলিক সংখ্যা অবশ্যই 6k + 1 অথবা 6k-1 আকারের হবে। অন্য কোনো রূপ সম্ভবই নয়, কারণ সব পূর্ণসংখ্যাই ওই ছয়টি ভাগের কোনো একটিতে পড়ে। প্রমাণ এখানেই শেষ!
∎ বাস্তব উদাহরণ দিয়ে যাচাই
আমরা যদি কিছু মৌলিক সংখ্যা মিলিয়ে দেখি তবে দেখা যাবে:
৫ = ৬(১) - ১, ৭ = ৬(১) + ১, ১১ = ৬(২) - ১, ১৩ = ৬(২) + ১
১৭ = ৬(৩) - ১, ১৯ = ৬(৩) + ১, ২৩ = ৬(৪) - ১, ২৯ = ৬(৫) - ১, ৩১ = ৬(৫) + ১
দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি মৌলিক সংখ্যাই এই নিয়মটি মেনে চলছে।
∎ একটি সতর্কবার্তা
মনে রাখতে হবে যে, সব মৌলিক সংখ্যা (২ আর ৩ বাদে) 6k ± 1 আকারের, কিন্তু 6k ± 1 আকারের সব সংখ্যা মৌলিক নয়! উদাহরণস্বরূপ: k = 4 হলে 6(4) + 1 = 25 = 5 × 5। অর্থাৎ ২৫ সংখ্যাটি এই নিয়মে পড়লেও তা মৌলিক নয়। তাই এই নিয়মটি মৌলিক সংখ্যা খোঁজার পরিধি ছোট করে দেয়, কিন্তু এটি কোনো সংখ্যাকে মৌলিক বানায় না।
∎ প্রথম চমক: যমজ মৌলিকের গুণফল
যে দুটি মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান মাত্র ২, তাদের বলা হয় যমজ মৌলিক। যেমন: (৫, ৭), (১১, ১৩), (১৭, ১৯), (২৯, ৩১)…। ৩-এর পরের যমজ মৌলিকেরা সব সময় 6k - 1 আর 6k + 1 আকারে থাকে, কারণ 6k ± 1 ছাড়া অন্যরূপে যমজ হওয়া সম্ভব নয়। এবার এদের গুণ করে ১ যোগ করলে যা হয়:
(6k - 1)(6k + 1) + 1 = 36k2 - 1 + 1 = 36k2
অর্থাৎ এর ফল সব সময় একটি পূর্ণবর্গ সংখ্যা এবং ৩৬ দিয়ে বিভাজ্য! যেমন: ৫ × ৭ + ১ = ৩৬, ১১ × ১৩ + ১ = ১৪৪, ১৭ × ১৯ + ১ = ৩২৪ = ১৮২।
∎ দ্বিতীয় চমক: p2 - 1 আর ২৪
৩-এর চেয়ে বড় যেকোনো মৌলিক সংখ্যা p ধরলে দেখা যায়, p2 - 1 সব সময় ২৪ দিয়ে বিভাজ্য হয়!
৫২ - ১ = ২৪, ৭২ - ১ = ৪৮, ১১২ - ১ = ১২০, ১৩২ - ১ = ১৬৮
এর কারণ হলো, p2 - 1 = (p - 1)(p + 1)। যেহেতু p বিজোড়, তাই p - 1 আর p + 1 দুটিই জোড় সংখ্যা, এবং পরপর দুটি জোড় সংখ্যার মধ্যে একটি অবশ্যই ৪ দিয়ে বিভাজ্য। ফলে গুণফলে ২ × ৪ = ৮ থাকে। আবার p - 1, p, p + 1 পরপর তিনটি সংখ্যার মধ্যে একটি অবশ্যই ৩ দিয়ে বিভাজ্য হবে, আর সেটি p হতে পারে না (যেহেতু p মৌলিক)। তাই গুণফলে ৩-ও থাকে। ৮ আর ৩ সহমৌলিক হওয়ায় ৮ × ৩ = ২৪ দিয়ে এটি বিভাজ্য হয়!
∎ গাণিতিক সতর্কতা
এখানে গাণিতিক আরোহ (Mathematical Induction) পদ্ধতি কার্যকর হয় না। আরোহ পদ্ধতিতে দেখাতে হয় যে, n-এ সত্য হলে n + 1-এ সত্য। কিন্তু একটি মৌলিক সংখ্যা থেকে পরবর্তী মৌলিক সংখ্যাটি কত দূরে থাকে, তা নির্দিষ্ট করে কেউ জানে না, তাই এখানে ‘পরের ধাপ’ ধরা যায় না। এই প্রমাণের আসল শক্তি হলো ভাগশেষের যুক্তি: সব সংখ্যাকে কয়েকটি দলে ভাগ করে দেখানো যে, কোন দলে মৌলিক সংখ্যা থাকতে পারে না।
গণিত কেবল কিছু সূত্রের সমষ্টি নয়, বরং এটি সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুন্দর সব প্যাটার্ন খুঁজে বের করার এক অনন্য বিজ্ঞান।
এই প্রমাণটি আমি ভালোভাবে শিখেছি আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী ও তামজীদ মোর্শেদ রুবাবের গণিতের স্বপ্নযাত্রা-১: আর্ট অব প্রবলেম সলভিং আর গণিতের স্বপ্নযাত্রা-২: গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম ধাপ বই থেকে।
পাঠকদের জন্য একটি প্রশ্ন: ৩-এর চেয়ে বড় কোনো মৌলিক সংখ্যার বর্গকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ কত হয়? (উত্তর: সব সময় ১। কারণ, p2 - 1 ২৪ দিয়ে বিভাজ্য, তাই ১২ দিয়েও বিভাজ্য হবে)।
সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।
— লেখা: π মুয়ায ইবনে মাসুদ