কল্পনা করুন, আপনি বাসা থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে আপনাকে প্রথমে পুরো পথের অর্ধেক দূরত্ব পার হতে হবে। এরপর যা বাকি রইল, তার আবার অর্ধেক পথ অতিক্রম করতে হবে। তারপর আবারও বাকি অংশের অর্ধেক...। এভাবে যদি বাকি পথের অর্ধেক পার হওয়ার প্রক্রিয়া চলতেই থাকে, তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আপনি কি আদৌ কখনো স্কুলে পৌঁছাতে পারবেন?
শুনতে কিছুটা হাস্যকর মনে হতে পারে, তবে আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক জেনো ঠিক এই প্রশ্নটিই উত্থাপন করে পুরো বিশ্বকে বিভ্রান্ত করেছিলেন।
∎ জেনোর যুক্তি
জেনোর যুক্তি ছিল এমন যে, আপনি যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হাঁটেন, তখন প্রথমে আপনাকে অর্ধেক পথ পার হতে হয়। এরপর বাকি পথের অর্ধেক, তারপর পুনরায় বাকি অংশের অর্ধেক। এই প্রক্রিয়া অসীমবার চলতে থাকবে। প্রতিবার আপনি বাকি দূরত্বের অর্ধেক পার করবেন, কিন্তু গন্তব্য অর্থাৎ শূন্য বিন্দুতে কখনোই পৌঁছাতে পারবেন না। কারণ, গাণিতিকভাবে সব সময় কিছু না কিছু দূরত্ব বাকি থেকে যাবে।
বিষয়টিকে গাণিতিক রূপ দিলে দাঁড়ায়:
১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... (অসীম পর্যন্ত)
জেনো মনে করেছিলেন, যেহেতু এখানে অসীমসংখ্যক ধাপ রয়েছে এবং অসীমসংখ্যক ধাপ পার হতে অসীম সময়ের প্রয়োজন, তাই বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছানো অসম্ভব। অথচ আমরা প্রতিদিন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করি। তাহলে এই যুক্তির গোলমালটা কোথায়?
∎ আসল সমস্যাটা কোথায়?
মূল সমস্যাটি হলো এই ধারণায় যে, ‘অসীমসংখ্যক ধাপ’ মানেই ‘অসীম সময়’। কিন্তু গণিতের দৃষ্টিতে এটি সব সময় সত্য নয়। এখানে প্রকৃত প্রশ্নটি হওয়া উচিত ছিল— এই অসীমসংখ্যক ভগ্নাংশের যোগফল আসলে কত হয়?
১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... = ?
হিসাব করে দেখলে দেখা যায়, প্রথম দুটি পদের যোগফল ৩/৪। প্রথম তিনটি পদের যোগফল ৭/৮ এবং প্রথম চারটি পদের যোগফল ১৫/১৬। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতিবারই যোগফলটি ১-এর চেয়ে ছোট থাকছে, তবে ক্রমাগত ১-এর কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে।
আপনি যত বেশি পদ যোগ করবেন, যোগফল তত বেশি ১-এর নিকটবর্তী হবে, যদিও তা কখনো ১-কে ছাড়িয়ে যাবে না। গণিতের ভাষায় এই ধরনের অসীম যোগফলকে বলা হয় অসীম শ্রেণি (Infinite Series)। যখন এমন একটি যোগফল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যায়, তখন বলা হয় শ্রেণিটি সেই সংখ্যায় অভিসারী (Convergent)।
ফলে চূড়ান্ত উত্তরটি দাঁড়ায়:
১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ১/১৬ + ... = ১
অর্থাৎ, অসীমসংখ্যক ধাপ যোগ করলেও যোগফলটি একটি সসীম (finite) সংখ্যায় গিয়ে থেমে যায়। এটাই ছিল জেনোর প্যারাডক্সের রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি। অসীমসংখ্যক ধাপ থাকলে অসীম সময় লাগবে— এই ধারণাটিই ভুল ছিল।
∎ সময়ের হিসাবেও একই ব্যাপার
ধরা যাক, আপনি ১ মিনিটে পুরো পথ পার হন। সেক্ষেত্রে প্রথম অর্ধেক পথ পার হতে সময় লাগবে ১/২ মিনিট। পরের অর্ধেক পার হতে লাগবে ১/৪ মিনিট। এভাবে প্রতিটি ধাপে সময়ও কমতে থাকবে, ঠিক দূরত্বের মতো। মোট সময়ের হিসাব হবে—
১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ... = ১ মিনিট
যদিও ধাপের সংখ্যা অসীম, কিন্তু প্রতিটি ধাপে ব্যয় হওয়া সময় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে মোট সময় যোগ করলে তা ঠিক ১ মিনিটেই গিয়ে থামে। এই কারণেই আপনি গন্তব্যে ঠিক ১ মিনিটেই পৌঁছে যান; এখানে কোনো ‘অসীম সময়’ লাগে না। জেনোর ভুলটি ছিল এখানেই। তিনি ধরে নিয়েছিলেন অসীমসংখ্যক জিনিসের যোগফল সবসময় অসীম হবে, অথচ প্রতিটি অংশ যদি ক্রমে ছোট হতে থাকে, তবে তাদের যোগফল সহজেই একটি সসীম সংখ্যা হতে পারে।
আড়াই হাজার বছর আগের এই সহজ প্রশ্নটি— ‘বাকি পথের অর্ধেক অর্ধেক পার হতে থাকলে কী হয়?’— আজও গণিতের একটি মৌলিক ও সুন্দর ধারণা ‘অসীম শ্রেণির অভিসারিতা’ শেখানোর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে টিকে আছে। তাই অসীমকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অসীমও যে সসীম সীমানায় ধরা দেয়, এটি তারই এক চমৎকার প্রমাণ।
গণিত ইশকুল
সহযোগিতায়:
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি