যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর হুমকির বিপরীতে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এই উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ইরানে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই বিষয়ে ভিন্ন সুর শোনা গেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কণ্ঠে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শনিবার বলেছেন, ‘কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলে আমরা তাতে আগ্রহী।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। গত ২৭ অক্টোবর সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে প্রাপ্ত চূড়ান্ত তথ্যানুযায়ী, কোনো একক দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন লাভ করতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই মিত্রদেশের নির্বাচনের ফলাফল ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে হরমুজ প্রণালির সমুদ্রতলে থাকা ইন্টারনেট ও যোগাযোগের তারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল ইরান। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্তব্য করেছেন, ইরান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ‘সুযোগ এসেছে, এমন ঐতিহাসিক সুযোগ একবারই আসে’।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যেকোনো মাত্রার বা ধরনের হুমকির জবাব দিতে হবে তাৎক্ষণিক, জোরালোভাবে ও ভৌগোলিক কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই।’ ইরানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই কথা জানানো হয়েছে।
খামেনি সামরিক কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তালিকায় ‘মার্কিন ও জায়নবাদী শত্রুর মালিকানাধীন সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উল্লেখ্য, মোজতবা খামেনির সঙ্গে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এই প্রথমবার প্রকাশ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি।
এদিকে যুদ্ধের আশঙ্কায় সাধারণ ইরানিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তেহরানের গৃহিণী ফরিবা এএফপি-কে জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার বোমা হামলার পর থেকে সাধারণ ইরানিরা ‘এক বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন’।
তবে পূর্ণমাত্রার সংঘাতের সম্ভাবনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না রাজধানীর অনেক বাসিন্দা। চল্লিশোর্ধ্ব এক বিক্রয়কর্মী ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা আরেকটি যুদ্ধকে ভয় পাই না। ৪৮ বছর ধরেই আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মাধ্যমেই পরিবহন করা হতো। গতকাল শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, প্রণালিটি অতিক্রম করার সময় মাইন বিস্ফোরণে একটি জাহাজে আগুন ধরে যায়। এর আগে শুক্রবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছিল, ‘কিছু ঘটনার’ মুখে পড়ার পর অথবা মাইন বিস্ফোরণে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারকে তাদের যাত্রা বন্ধ করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের এই প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।