ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান বা হামলা না চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলে নির্বাচনের পর ইরানে পুনরায় হামলা চালানোর যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই সতর্কবার্তা প্রদান করেন খামেনি।

আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি ইরানকে ‘একেবারে শেষ করে দেওয়ার’ কথা ভাবছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক’ সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনো দল বা জোট এককভাবে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় এখনো সেখানে সরকার গঠিত হয়নি।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, শনিবার শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে মোজতবা খামেনি বলেন, ‘যেকোনো স্তরের বা ধরনের হুমকির তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দিতে হবে। আর এই জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা মানা হবে না।’

উল্লেখ্য, ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোজতবা খামেনির এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলি আবদোল্লাহি, সেনাপ্রধান আমির হাতামি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার আহমাদ ওয়াহিদি উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর মার্চ মাসে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও আহত হয়েছিলেন।

শনিবারের ওই বৈঠকে মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকাটি হালনাগাদ করা হয়। তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আমেরিকান ও জায়নবাদী শত্রুদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব ধরনের সম্পদ’ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সম্পদের ওপর হামলা চালায়। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে নতুন করে যেন যুদ্ধ শুরু না হয়, সেজন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।

এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শুক্রবার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে পৌঁছেছেন। পাশাপাশি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজায়ির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত বুধবার জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা প্রধানকে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন। মূলত আলোচনার পথ পুনরায় উন্মুক্ত করতে এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা এড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি নিশ্চিত করেছেন যে, ইরান চিঠিটি হাতে পেয়েছে।

তা সত্ত্বেও, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে তেহরান ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকারামিনিয়া বলেন, নতুন করে শত্রুতা শুরু হলে তা কেবল যুদ্ধের পরিধিই বাড়াবে। ‘যুদ্ধের লেলিহান শিখা নিঃসন্দেহে আরও অনেক বড় ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।’