হেমন্তের এক অলস দুপুরে হঠাৎই দৃষ্টি আকর্ষণ করল একগুচ্ছ উজ্জ্বল ফুল। কমলা ও হলুদের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ যেন এই ফুলগুলোর মাঝে। মনে হয়, সূর্যের প্রখর আলো যেন পাপড়িগুলোর ভেতরেই আশ্রয় নিয়েছে। থোকায় থোকায় ফুটে থাকা এই ফুলগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন আলোর রং মেখে পুষ্পগুচ্ছের মাধ্যমে ধরিত্রীকে অঞ্জলি নিবেদন করা হচ্ছে।

আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ ভবনের চত্বরে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও বাহারি গাছ রয়েছে। সেই সব উদ্ভিদের মধ্যে অনুচ্চ ও ঝোপালো এই গাছটি আলাদাভাবে নজর কাড়ে। হেমন্তের মিষ্টি রোদে এর ফুলের সৌন্দর্য আরও বহুগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ঋতু পরিবর্তিত হলেও এর শোভা আরও কিছুকাল প্রকৃতিকে রাঙিয়ে রাখবে বলে আশা করা যায়।

এই গাছের একটি সহোদরা প্রজাতিকে আমরা প্রায় সবাই চিনি, যার নাম চন্দ্রপ্রভা বা সোনাপাতি। সেই ফুলের রং স্বর্ণাভ হলুদ, যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে পাপড়িতে। আর তারই আরেক সহোদরা হলো এই কমলা রঙের ফুলটি। গাছটি সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছে, যার ফলে এখনো এর কোনো নির্দিষ্ট বাংলা নামকরণ করা হয়নি। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘অরেঞ্জ বেল’ বা ‘অরেঞ্জ ট্রাম্পেট ফ্লাওয়ার’। ফুলের গড়ন এবং রঙের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইংরেজি নামের আদলে এর বাংলা নাম হতে পারে ‘কমলাঘণ্টি’।

সোনাপাতি এবং কমলাঘণ্টি— এই দুটিই বিগনোনিয়েসি গোত্রের উদ্ভিদ। এই গোত্রের ফুলগুলোর গড়ন অনেকটা ঘণ্টার মতো হয়ে থাকে। পারুল ও ধারামারা ফুলের গড়নও ঠিক একই রকম। এরা সবাই এই গোত্রের টেকোমা গণের অন্তর্ভুক্ত। ‘টেকোমা’ নামটি এসেছে নাহুয়াটাল ভাষার ‘টেকোমাক্সোচিটল’ শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো ‘নলাকার ফুল’।

পৃথিবীতে টেকোমা গণের মোট সাতটি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে এই গণের অন্তত তিনটি প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এ দেশে অনেক দিন ধরেই সোনাপাতি (Tecoma stans) গাছ বিভিন্ন বাগান ও উদ্যানে লাগানো হচ্ছে। রমনা উদ্যানে গেলে এই গাছের প্রচুর উপস্থিতি চোখে পড়ে। এছাড়া খামারবাড়ি মোড় থেকে বিজয় সরণি মেট্রোস্টেশনের দিকে যাওয়ার পথের সড়কদ্বীপেও এই গাছ দেখা যায়। প্রায় সারা বছরই এতে ফুল ফোটে, তবে শরৎ ও হেমন্তকালে ফুলের আধিক্য সবচেয়ে বেশি থাকে।

চন্দ্রপ্রভা বা সোনাপাতি মূলত একটি চিরসবুজ গুল্ম কিংবা ঝোপালো ছোট বৃক্ষ। এই গাছটি সাধারণত তিন থেকে চার মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর পাতা যৌগিক প্রকৃতির। একটি পত্রদণ্ডের দুই পাশে দুই থেকে তিন জোড়া পত্রক থাকে এবং শীর্ষে থাকে আরেকটি পত্রক। প্রতিটি পত্রকের কিনারা করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা হয়।

অন্যদিকে, কমলাঘণ্টি (Tecoma fulva subsp. guarume) হলো আধা চিরসবুজ এবং দ্রুতবর্ধনশীল গুল্ম বা ছোট বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত এক থেকে তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা ও শাখা-প্রশাখার কারণে এটি বেশ ঝোপালো হয়ে ওঠে। নিয়মিত ছেঁটে রাখলে গাছটি খাটো ও অধিক ঝোপালো থাকে এবং এতে ফুলও বেশি ফোটে।

এর পাতা পক্ষল যৌগিক এবং চকচকে সবুজ রঙের হয়। পত্রকের কিনারাগুলো খাঁজকাটা। গাছে গুচ্ছাকারে আগুনের মতো কমলা-লাল রঙের নলাকার ও ঘণ্টাকৃতির ফুল ফোটে। ফুলের গোড়ার অংশ নলাকার হলেও মুখের দিকটা চওড়া। পাপড়িগুলো পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত। ফুলের ভেতরে গলার কাছে গাঢ় রঙের আঁচড় বা লম্বা রেখা দেখা যায়। বর্তমানে এর কয়েকটি সংকর জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যার ফলে ফুলে রঙের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। সংকর জাতের গাছগুলো তুলনামূলক খাটো বা বামন আকৃতির হওয়ায় এগুলো টবে লাগানোর জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

ফুলের মধু সংগ্রহের জন্য মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিংবার্ড এখানে ভিড় করে। এমনকি পিঁপড়ারাও এই ফুলে ভিড় জমায়। গ্রীষ্মকাল থেকেই ফুল ফোটা শুরু হয় এবং শরৎ ও হেমন্তে প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটে। শীতকালেও কিছু ফুল দেখা যায়।

এই গাছটি কম ও বেশি— উভয় ধরনের তাপমাত্রাই সহ্য করতে পারে। খরাও সইতে পারে এই উদ্ভিদ, বিশেষ করে বড় গাছগুলো। এর ফল সরু, লম্বা ও চ্যাপটা আকৃতির। ফলটি শুঁটি বা ক্যাপসুলের মতো এবং দুটি খণ্ডে বিভক্ত। ফল ধরার সময় এটি সবুজ থাকে, তবে পাকতে শুরু করলে শুকিয়ে কাষ্ঠল বাদামি রং ধারণ করে। পুরোপুরি পেকে গেলে শুঁটিটি মাঝ বরাবর ফেটে যায় এবং সেখান থেকে বীজ বেরিয়ে পড়ে। তবে চন্দ্রপ্রভার মতো এই গাছে খুব বেশি ফল ও বীজ হয় না।

রোদযুক্ত ও খোলামেলা জায়গায় লাগালে গাছের পাতা ও ফুলের রং আরও উজ্জ্বল হয়। তবে আধোছায়াতেও এটি জন্মাতে পারে। সাধারণত আধা-পরিণত কাণ্ড বা ডালের কাটিং থেকে এই গাছের চারা তৈরি করা হয়। বীজ থেকেও চারা উৎপাদন সম্ভব। উদ্ভিদটির আদি নিবাস পেরু।