ফুটবল, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র কি কখনো একই সূত্রে গাঁথা হতে পারে? অনেকের কাছে এটি অসম্ভব মনে হলেও বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়। সম্প্রতি আমরা দেখেছি, জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়া লিওনেল মেসিকে সম্মান জানিয়ে বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। এবার সেই ধারায় পেরুর দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলের সমতলভূমি থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় জন্ম নেওয়া একটি সুগন্ধি ফুলের নাম রাখা হয়েছে ফুটবল কিংবদন্তি মেসির নামে। দেশটির একদল বিজ্ঞানী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন সূত্রে জানা গেছে, আন্দিজ পর্বতমালায় জন্ম নেওয়া এই উদ্ভিদটি এতদিন উদ্ভিদবিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল। ফুটবল তারকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদটির নামকরণ করেছেন ‘সালভিয়া মেসি’ (salvia messii)।

পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার পাথুরে ঢালে জন্ম নেওয়া এই উদ্ভিদের পাপড়িগুলো নীল ও সাদা রঙের। একদল উদ্ভিদ গবেষক এই ফুল গাছটির বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন। এটি মূলত ল্যামিয়াসি (Lamiaceae) পরিবারের একটি গুল্মজাতীয় সুগন্ধি উদ্ভিদ। উল্লেখ্য, এই একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হলো তুলসী, পুদিনা, রোজমেরি এবং সাধারণ সেজের মতো পরিচিত গাছগুলো।

এই বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদটি আবিষ্কার ও বর্ণনা করেছেন পেরুর সান মার্কোস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের পল গঞ্জালেস, আর্জেন্টিনার স্বাধীন গবেষক রোলান্দো উরিয়া এবং পেরুর হুরারাঙ্গো নেচারের জ্যঁ কাপচা-রামোস। তাঁরা তাঁদের এই গবেষণালব্ধ ফলাফল বৈজ্ঞানিক জার্নাল ফাইটোতাক্সায় প্রকাশ করেছেন।

মায়মোনাইডস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ন্যাচারাল, এনভায়রমেন্টাল অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সায়েন্সেস এবং আজারা ফাউন্ডেশনের গবেষক ক্লদিও বের্তোনাত্তি এই বিষয়ে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানুষেরই সৃষ্টি, তাই কোনো প্রকৃতিবিদ বা বিজ্ঞানী লিওনেল মেসি ব্যক্তিত্বের মতো গুণাবলি ও আবেগের পরিমণ্ডলের বাইরে গিয়ে কাজ করেন না। এটিই ব্যাখ্যা করে, কেন বিভিন্ন অঞ্চলের এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী বা উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই শ্রদ্ধাঞ্জলিতে এক হয়েছেন, যা তাঁর নামকে অমর করে রাখবে।’

তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলদাতার নামে কোনো প্রজাতির নামকরণ করার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে আর্জেন্টিনার সালতায় বারিতু জাতীয় পার্কে আবিষ্কৃত একটি ছত্রাকের নাম রাখা হয়েছিল ‘সেরকোপেমসেস মেসি’। এছাড়া সেখানে পাতাগোনিয়ান প্রজাতির মাকড়সার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আকান্থোগোনাটাস মেসি’, পুনা অঞ্চলের এক প্রজাতির টিকটিকির নাম ‘লিওলায়েমুস মেসি’ এবং আন্দেজের প্রাগৈতিহাসিক শকুনের নাম রাখা হয়েছে ‘ভালচার মেসি।’ এমনকি ঝিনুকের মতো দেখতে প্রাগৈতিহাসিক খোলসি একটি প্রাণীর নামও রাখা হয়েছে ‘ডিস্কনিস্কা মেসি।’

রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি অব লন্ডনের পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিদ ও উদ্ভিদ প্রজননবিদ রোলান্দো উরিয়া কিছু অপেশাদারের শেয়ার করা রেকর্ড দেখার সময় একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন, পেরুর উচ্চভূমি অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছবি কোনো পরিচিত প্রজাতির বইয়ের তথ্যের সঙ্গে মিলছে না। এই সন্দেহের বশেই উরিয়া যোগাযোগ করেন লিমার ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিশিষ্ট পেরুভিয়ান উদ্ভিদবিদ পল গঞ্জালেস এবং জীববিজ্ঞানী জ্যঁ কাপচা রামোসের সঙ্গে। এরপর তাঁরা সবাই মিলে একটি আনুষ্ঠানিক গবেষণা দল গঠন করেন। তাঁরা ঐতিহাসিক আর্কাইভ পর্যালোচনা করেন, বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালার নমুনাগুলো নিয়ে গবেষণা করেন এবং পর্বতমালাটির সবচেয়ে দুর্গম ও কঠিন ঢালগুলোতে বহু বছর ধরে অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর তাঁরা নিশ্চিত হন যে, দেড় মিটার পর্যন্ত উঁচু এই শক্তপোক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদটিকে এর আগে কেউ শ্রেণিবদ্ধ করেনি।

নতুন আবিষ্কৃত কোনো উদ্ভিদের নামকরণ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়, এটি ইচ্ছেমতো করা সম্ভব নয়। যখন কোনো বিশেষ ব্যক্তিত্বের সম্মানে কোনো প্রজাতির নামকরণ করা হয়, তখন বিজ্ঞানীরা একটি লাতিন ব্যাকরণগত নিয়ম মেনে চলেন। সেই নিয়ম অনুযায়ী পদবির শেষে একটি ‘আই’ (i) যোগ করা হয়। এই ক্ষেত্রে এর অর্থ দাঁড়ায়—‘মেসির উদ্ভিদ’।

এই ফুলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, ফুল ফোটার পর এর পাপড়িগুলোতে সাদা ও অত্যন্ত কোমল হালকা নীলের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। এই রঙের বিন্যাস অনেকটা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সির রঙের মতো। ফুটবল প্রেমীদের কাছে এটি যেন প্রকৃতি প্রদত্ত একটি পোস্টকার্ড।

কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত এক আর্জেন্টাইন পোস্টকার্ড উপহার দিয়েছে, যা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে আন্দিজের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে এক সূত্রে গেঁথে দিল।