চলতি বছরের ২৮ জুলাই ঢাকার বনানীতে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। শ্রাবণ মাস হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতিতে তখন বৃষ্টির লেশমাত্র ছিল না। কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটার সময় বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাত মৈত্রী কমপ্লেক্সের সামনে সারিবদ্ধভাবে রাখা বেশ কিছু ফুলের টব চোখে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের গাছের ভিড়ে একটি টবে ফুটে থাকা শুভ্র সাদা ফুলগুলো বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাছে গিয়ে দেখা যায়, এটি সাদা পেন্টাস। ফুলগুলোর অসাধারণ স্নিগ্ধ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ছবি না তুলে থাকা সম্ভব হয়নি।
প্রকৃতির বিশাল সৌন্দর্যভান্ডারে এমন অনেক ফুল রয়েছে, যাদের রং, গড়ন ও স্নিগ্ধ উপস্থিতি খুব সহজেই মানুষের মন জয় করে নেয়। সাদা পেন্টাস ঠিক তেমনই একটি ফুল। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এর বৈজ্ঞানিক নাম Pentas lanceolata। এটি রুবিয়েসি (Rubiaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এই গাছের ছোট ছোট পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো একসঙ্গে ঘন গুচ্ছে ফুটে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাঢ় সবুজ পাতার বুকে ছড়িয়ে আছে একগুচ্ছ শুভ্র তারা। তারার মতো এই ফুলের গুচ্ছের কারণেই ইংরেজিতে উদ্ভিদটি ‘ইজিপশিয়ান স্টারক্লাস্টার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
সাদা পেন্টাসের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রঙের সরলতা। গাঢ় সবুজ পাতার সঙ্গে সাদা ফুলের এই বৈপরীত্য গাছটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। যদিও ফুলগুলো আকারে ছোট, তবে একসঙ্গে অসংখ্য ফুল ফোটে বলে পুরো গাছটিই অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।
পেন্টাস শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ penta থেকে, যার অর্থ হলো পাঁচ। ফুলের পাঁচটি পাপড়ির সঙ্গে এই নামের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উদ্ভিদটির আদি বিস্তৃতি আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে আরব উপদ্বীপের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এটি শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।
সাদা ছাড়াও পেন্টাসের লাল, গোলাপি, বেগুনি ও ল্যাভেন্ডার রঙের জাত পাওয়া যায়। তবে সবুজ পাতার পটভূমিতে সাদা ফুলের গুচ্ছের সৌন্দর্য আলাদাভাবে চোখে পড়ে। সাদা পাপড়ি আর সবুজ পাতার এই মেলবন্ধনে গাছটি এক পরিচ্ছন্ন, শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ লাভ করে।
সাধারণত পেন্টাস একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। অনুকূল পরিবেশ পেলে গাছটি ১ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে এটি আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এর কাণ্ড থেকে বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা বের হয়ে একটি ঝোপালো আকৃতি তৈরি করে। সঠিক ও উপযুক্ত পরিচর্যায় গাছটি আরও ঘন ও সুগঠিত হয়ে ওঠে।
এই উদ্ভিদের পাতাগুলো সাধারণত বিপরীতক্রমে সাজানো থাকে। এগুলো ডিম্বাকৃতি থেকে বর্শাকৃতির হয়ে থাকে এবং অগ্রভাগ সরু ও সুচালো। পাতার রং গাঢ় সবুজ, যার পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম লোম থাকতে পারে এবং শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট। এই সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা সাদা ফুলের গুচ্ছই মূলত গাছটির সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে পেন্টাসের প্রধান আকর্ষণ হলো এর ফুল। অসংখ্য ক্ষুদ্র ও নলাকার ফুল একত্র হয়ে ঘন গুচ্ছ তৈরি করে। ফুলের অগ্রভাগে পাঁচটি পাপড়ি তারার মতো ছড়িয়ে থাকে। জাত এবং পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে একটি গুচ্ছে ফুলের সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। যখন একসঙ্গে অনেক ফুল ফোটে, তখন পুরো গাছটি যেন শুভ্র তারার সমারোহে ভরে ওঠে।
উষ্ণ আবহাওয়ায় পেন্টাস দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ফোটাতে সক্ষম। পর্যাপ্ত আলো, উষ্ণতা ও উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও এই গাছটিতে দীর্ঘ সময় ফুল দেখা যায়। রোদযুক্ত স্থানে এর বৃদ্ধি এবং ফুল ফোটার হার সাধারণত ভালো হয়। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলো পেলে গাছটি সতেজ থাকে। এটি আংশিক ছায়াতেও বেঁচে থাকতে পারে, তবে অতিরিক্ত ছায়ায় ফুলের সংখ্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পেন্টাস কেবল একটি সৌন্দর্যবর্ধক উদ্ভিদই নয়, বরং পরাগায়নকারী প্রাণীদের জন্যও এটি অত্যন্ত উপকারী। এর ফুলের মধু প্রজাপতি, মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। কিছু কিছু অঞ্চলে হামিংবার্ডের মতো পাখিও এই ফুলের মধু সংগ্রহ করতে আসে। ফলে বাগানে পেন্টাস লাগালে পরাগায়নকারী প্রাণীদের জন্য খাদ্যের উৎস তৈরি হয়।
বাগানের সীমানা সাজানো, ফুলের বেড তৈরি, রাস্তার দুই পাশে সৌন্দর্য বাড়ানো কিংবা বারান্দার টবে চাষ—সব ক্ষেত্রেই পেন্টাস অত্যন্ত উপযোগী। সাদা পেন্টাসের সঙ্গে লাল, গোলাপি বা বেগুনি পেন্টাস লাগালে বাগানে রঙের এক চমৎকার সমাহার তৈরি হয়। সবুজ পাতার ঘনত্ব এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ফোটার কারণে বাগান সবসময় প্রাণবন্ত থাকে।
বাড়ির ছোট্ট বারান্দা হোক কিংবা বিস্তৃত বাগান, সাদা পেন্টাস সেখানে যোগ করতে পারে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। একই সঙ্গে পরাগায়নকারী প্রাণীদের জন্যও এটি একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সৌন্দর্য এবং প্রকৃতিবান্ধব বাগানের সমন্বয়ে তাই ইজিপশিয়ান স্টারক্লাস্টার হতে পারে ফুলপ্রেমীদের জন্য এক চমৎকার পছন্দ।
— চয়ন বিকাশ ভদ্র: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ।