যিনি এক পলকেই পদ্মা ও মেঘনার বিশালতাকে পাড়ি দিতে চান, আর যার মতে প্রেম কোনো চরের জমির মতো নয়, অথচ সারা জীবন প্রেমের জমিতেই চাষ করে গেছেন—তিনিই আমাদের সবার প্রিয় ‘চিরসবুজ’ সুদর্শন গায়ক কুমার বিশ্বজিৎ। সম্প্রতি কবির বকুল তাঁর সাথে এক প্রাণবন্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, যাকে তিনি পুতুলের মতো সাজিয়ে হৃদয়ের কোটরে রাখতে চেয়েছিলেন, তিনি কি এখনো সেখানে আছেন? নাকি তিনি এখন বাইরে এসে দাবি করছেন যে তিনি পুতুল নন, বরং একজন মানুষ?
হাসিমুখে কুমার বিশ্বজিৎ উত্তর দেন, “আছে, আছে! কোটরেই আছে। বের হইতে চায়, আমি বলি ‘ভাড়া দাও’! কোটরের ভাড়া এখন অনেক!”
তাঁর জনপ্রিয় গান ‘যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে বসন্ত আমার...’ এর কথা উঠলে প্রশ্ন করা হয়, সীমান্তে বসন্ত কীভাবে সম্ভব?
গায়ক ব্যাখ্যা করেন, “ওইটা মনের সীমান্ত! পাসপোর্ট–ভিসা লাগে না। ভালোবাসার সীমান্তে সব সময় বসন্ত। বিজিবি আটকাবে না!”
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘চন্দনা’র কথা। ‘চন্দনা গো, রাগ কোরো না...’ গানের সেই রহস্যময়ী চন্দনা আসলে কে? ৪০ বছর ধরে তাকে খোঁজার চেষ্টা চলছে। এই বিষয়ে তিনি রসিকতা করে বলেন, “চন্দনা হলো আমার গানের নায়িকা। ৪০ বছর ধরে খুঁজছ? পাবে না। কারণ, চন্দনা এখন নাতি-নাতনি নিয়ে ব্যস্ত!”
আবার তাঁর অন্য একটি গানে আছে ওপেন হার্ট সার্জারির কথা— ‘ও ডাক্তার, আপনি যখন করবেন আমার ওপেন হার্ট সার্জারি...’। প্রশ্ন করা হয়, সেই রূপসীকে কি ডাক্তার সার্জারির মাধ্যমে পেয়েছিলেন, নাকি অপারেশনটি সফল হয়নি?
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “অপারেশনের পর ডাক্তার বললেন, ‘আপনার রোগ প্রেম না, গ্যাস্ট্রিক! রোজ রোজ তৈলাক্ত খাবার খান, তাই বুক জ্বলে!’ আমি তখন গাইলাম, ‘অন্তর জ্বলে রে জ্বলে, তখন আরও বেশি বেশি জ্বলে।’”
সংসার ও বৈরাগ্যের দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা উঠলে, বিশেষ করে ‘যারে ঘর দিলা, সংসার দিলা রে, তারে বৈরাগী মন কেন দিলা রে’ গানের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন করা হয়—সংসার কি ভালো লাগে না? নাকি গৃহকর্ত্রীর বকুনি কিংবা গ্যাস ও কারেন্ট বিলের চাপে বৈরাগী হতে ইচ্ছে করে?
এর উত্তরে তিনি বলেন, “এটা আমার কমপ্লেইন না, এটা পৃথিবীর সব বিবাহিত পুরুষের কমপ্লেইন! ঘর আছে, সংসার আছে, বাজার করতে হয়, বাচ্চার স্কুলের বেতন দিতে হয়...তখন মনে হয়, বৈরাগী হয়ে হিমালয়ে চলে যাই! কিন্তু যখনই বৈরাগী হতে যাব, তখনই মনে পড়ে হিমালয়েও তো ঠান্ডা, কম্বল লাগবে, কম্বলের টাকা কই পাব?”
বর্তমান যুগের ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে রোমান্টিক গানের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়। ‘তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে আসতে...’ গানের কথা এখনকার ছোট বারান্দার যুগে কতটা প্রাসঙ্গিক? যদি কেউ বারান্দার মানিপ্ল্যান্ট বা মরিচগাছ থেকে মরিচ চুরি করতে আসে, তবে কি তা নিয়ে রোমান্টিক গান লেখা সম্ভব?
কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, “তখন গানের লিরিকটা একটু বদলে যাবে! ‘তুমি রোজ বিকেলে আমার বারান্দায় টবের মরিচ নিতে আসতে, জানি না তুমি মরিচ না, ঝাল খেতে বেশি ভালোবাসতে!’”
সাম্পানে ঘর বাঁধার কথা বলে তিনি গেয়েছিলেন ‘আমি সাম্পানে বান্ধিব ঘর, তুমি সাথি হলে...’। বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি জানান, “সাম্পান আছে, কিন্তু ঘর নাই। ঘর এখন পদ্মা সেতুর নিচে চলে গেছে! এখন ফ্ল্যাটে থাকি, সাম্পানটা স্মৃতি হিসেবে রেখেছি।”
তাঁর ডাকনাম ‘তুলতুল’ নিয়ে মজার প্রশ্ন করা হয়। ছোটবেলায় মায়ের রাগের সময় কি এই নামটাই ‘টুলটুল’ হয়ে যেত? আর তা কি তাঁর কাছে কোনো বাদ্যযন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিত?
তিনি জানান, “রেগে গিয়ে কেউ ‘টুলটুল’ ডাকলে কোনো বাদ্যযন্ত্রের কথা মনে আসত না, মনে হতো আমি নিজেই একটা টুল (Tool), যা দিয়ে আজকে মার খাওয়ার পিঁড়ি তৈরি হবে! তবে নামটা বেশ আদুরে, মিষ্টি। নামটা শুনলে কারও মনেই বেশিক্ষণ রাগ থাকে না।”
বর্তমানে তিনি কানাডায় বসবাস করছেন। ঢাকার যানজট আর হর্নের শব্দ কি তিনি মিস করেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে এক গভীর বিষণ্ণতা। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, কানাডার নীরবতার মধ্যে যখন খুব একা লাগে, মনে হয় কোনো বিস্তীর্ণ সুনসান বিরান ভূমিতে চলে যাই। চিৎকার করে কাঁদি। এই সময় মাকে খুব মিস করি, আর তখন একা একা নিজের গানটাই গুনগুন করি, ‘মায়ের মমতা ছাড়া কে থাকে ভালো’।”
(উল্লেখ্য যে, এই সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক নয়।)