জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই নাজমুস শাহাদাত এক বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নিজের হাতখরচের টাকা নিজেই জোগাড় করা। সেই সময়ে তাঁর বড় ভাই নাজমুস সাকিব চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন। কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা এই দুই ভাই মিলে আয়ের নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন।
শাহাদাত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছিলেন, তাই ক্যারিয়ারের শুরুটা এই খাতেই করতে চেয়েছিলেন। কিছুকাল কাজ করলেও সেখানে তাঁর মন টেকেনি। এরপর দুই ভাই ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ব্যবসার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন।
শুরুতে শাহাদাত ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন ছবির স্লাইড শো তৈরি করে আপলোড করা হতো। তবে সেই প্রচেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। পরবর্তীতে তাঁরা ফেসবুক বোনাস (রিল, ছবি ও লেখার মাধ্যমে মেটা থেকে আয়) এবং কনটেন্ট মনিটাইজেশনের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। তখন তাঁদের মাথায় পণ্য বিক্রির কোনো চিন্তা ছিল না; বরং তাঁরা খুঁজছিলেন এমন কোনো কনটেন্ট, যা নেটিজেনদের দ্রুত আকর্ষণ করবে।
ঠিক এই সময়েই দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) টুলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। শাহাদাত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছোট ছোট কার্টুনধর্মী ছবি তৈরি করতে শুরু করেন। এরপর সেই কার্টুনের সাথে মজার সব কথা যুক্ত করে মিম তৈরির পরিকল্পনা করেন দুই ভাই। নিজেদের ফেসবুক পেজে এই মিমগুলো প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপেও শেয়ার করতে থাকেন তাঁরা। ধীরে ধীরে কিছু পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায় এবং পেজে যুক্ত হতে থাকে প্রচুর অনুসারী বা ফলোয়ার। পাশাপাশি তাঁরা নিজেদের একটি গ্রুপও তৈরি করেন।
এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁদের এক বিশাল দর্শকগোষ্ঠী। ফেসবুক ইনসাইটের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দুই ভাই জানতে পারেন, তাঁদের কনটেন্টের দর্শকদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, যাদের মধ্যে মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে বয়স, অবসরজীবন এবং দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি নিয়ে তৈরি রসিকতাগুলোই তাঁরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করছেন। পেজের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তাই তাঁদের সামনে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা খুলে দেয়।
মিমের সেই মজার কথাগুলো টি-শার্টে ছাপিয়ে বিক্রি করার চিন্তা মাথায় আসে শাহাদাত ও সাকিবের। এই পরিকল্পনায় যুক্ত হন তাঁদের খালাতো ভাই মোহাম্মদ হাসান রাফি, যিনি ডিজাইনিং কাজে দক্ষ ছিলেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁদের টি-শার্ট তৈরির যাত্রা।
তবে টি-শার্ট উৎপাদন ও সরবরাহের ঝামেলা তাঁরা নিজেদের কাঁধে নেননি। বরং একটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে নেন। শাহাদাতরা কেবল ফেসবুক ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের ডিজাইন প্রদর্শন করে অর্ডার সংগ্রহ করেন, আর পণ্য তৈরি থেকে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব পালন করে সেই বিদেশি কোম্পানিটি।
শাহাদাত বলেন, “শুরুতে কয়েক মাস কোনো আয় ছাড়াই আমরা পেজ ও গ্রুপের দর্শক বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা খরচ করতে চাইনি। বরং বিভিন্ন গ্রুপে মিম শেয়ার, ভালো ভালো কনটেন্ট বানিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো, নিজেদের একটা কমিউনিটি গড়ে তোলা—এসব দিকেই ছিল আমাদের মনোযোগ। ধীরে ধীরে এই চেষ্টার ফল আসতে শুরু করে। মিমের দর্শকেরাই হয়ে ওঠেন আমাদের পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা। এ পরিকল্পনায় দ্রুতই বেশ সাড়া পেতে শুরু করি আমরা।”
টি-শার্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তাঁদের পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে সোয়েটশার্ট, হুডি এবং টাম্বলারের (এক ধরনের পানির ফ্লাস্ক) মতো পণ্য। প্রতিটি পণ্যের নকশায় মিমের পরিচিত রসিকতা ও সংলাপগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে লক্ষ্য করেই তাঁরা ‘ইউআরপ্রিন্টজ ডটকম’ নামে নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করেছেন।
শাহাদাত জানান, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তাঁদের ব্যবসার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। হ্যালোইন ও বড়দিনের মতো উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে তাঁরা বিশেষ নকশার পণ্য তৈরি করেন, যা ক্রেতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
পণ্যের নকশা ও কনটেন্ট তৈরিতে এআই টুলের ব্যবহার তাঁদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। শাহাদাত বলেন, “সময়ের সঙ্গে এসব টুলের উন্নতি হওয়ায় কম সময়ে মানসম্পন্ন নকশা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশের পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।”
তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু প্রযুক্তির অবদান নেই; বরং দর্শকদের বয়স ও পছন্দ বোঝা, নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি এবং সেই কনটেন্টের সাথে পণ্যের সঠিক যোগসূত্র স্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শাহাদাত জানান, বর্তমানে তাঁদের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ (যেমন কাউ ক্রনিকলস, ডাকস গন ওয়াইল্ড, হার্ড হিউমার, হিলারিয়াস ক্যাট ইত্যাদি) এবং গ্রুপ মিলিয়ে মোট অনুসারী ও সদস্যের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে এক বছরেই তাঁরা ব্যবসায় প্রায় এক কোটি টাকা আয় করেছেন। ব্যবসার সাফল্য ও ওয়েবসাইটের জনপ্রিয়তার জন্য আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম শপবেজ থেকে তাঁরা স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্তমানে এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়ে ১৫ জনের বেশি মানুষ আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের হাতখরচ জোগানোর তাগিদ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি এখন এক বিশাল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে ঘরে বসেই বিদেশি বাজারে পণ্য বিক্রি করে মাসে লাখ টাকা আয় করছেন শাহাদাত ও সাকিব। তবে এই পথ চলা সব সময় সহজ ছিল না। ফেসবুকের নীতিমালা ও অ্যালগরিদমের পরিবর্তনের কারণে তাঁদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। কনটেন্টের ধরন এবং দর্শকদের পছন্দ বুঝতে তাঁদের রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি কমাতে তাঁরা শুধু ফেসবুকের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চান।
সহপ্রতিষ্ঠাতা নাজমুস সাকিব বলেন, “ভবিষ্যতে শুধু ফেসবুকের ওপর নির্ভর না করে ইনস্টাগ্রাম ও পিন্টারেস্টের মতো প্ল্যাটফর্মেও দর্শক ও ক্রেতা তৈরি করতে চাইছি আমরা। পাশাপাশি নিজেদের ওয়েবসাইটকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আছে, যেন ক্রেতারা সরাসরি সেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারেন এবং বারবার আমাদের কাছেই ফিরে আসেন।” এছাড়া মগ, ক্যাপ ও ব্যাগের মতো নতুন পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। ডিজাইন ও কনটেন্ট তৈরিতে নতুন নতুন এআই টুল ব্যবহার করে সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও তাঁরা ভাবছেন।