বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু আমাদের চিন্তা-চেতনা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রতিনিয়ত ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন সংবাদ, ছবি কিংবা ভিডিও এবং তা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিতর্ক এখন আমাদের জীবনের নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এমতাবস্থায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো কন্টেন্টের প্রতি একজন মুমিনের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত, তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়। বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কিছু শেয়ার করার অর্থ হলো অন্যের কথা প্রচার করা। স্ট্যাটাস দেওয়ার মাধ্যমে জনসমক্ষে নিজের মতামত জানানো হয়। আর কারও পোস্ট বা ছবিতে মন্তব্য করা কার্যত বাস্তবে কারও সম্পর্কে মন্তব্য করার মতোই সমান।
ফলে কথা বলা, দেখা এবং প্রচার করার বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও সেই নির্দেশনাগুলো একইভাবে প্রযোজ্য। বরং বাস্তব জীবনের মিথ্যার চেয়ে অনলাইন জগতের মিথ্যা অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এটি অত্যন্ত দ্রুত বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং দীর্ঘকাল ইন্টারনেটে সংরক্ষিত থাকে।
এই বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহানবী (সা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তির শাস্তি দেখেছিলেন, যার মিথ্যা মানুষ বহন করে নিয়ে যেত এবং তা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ত। কেয়ামত পর্যন্ত তাকে এই শাস্তি দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৬)
পবিত্র কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো।”
তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কন্টেন্ট সামনে এলে তাতে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে মুমিনদের জন্য নিচের ছয়টি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
প্রথমত, ইসলামে যা দেখা নিষিদ্ধ, তা থেকে বিরত থাকা। কোরআনে মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)। বাস্তবে যা দেখা নিষেধ, মোবাইলের স্ক্রিনেও তা দেখা নিষিদ্ধ। অশ্লীল ছবি বা নাচের ভিডিও এর অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে এ ধরনের কন্টেন্ট প্রচার করে এমন ব্যক্তি বা পেজকে ফলো করা ও লাইক দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। কারণ লাইক ও ফলোর মাধ্যমে সেই কন্টেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। আল্লাহ বলেছেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে তোমরা একে অন্যকে সাহায্য কোরো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)
দ্বিতীয়ত, নেতিবাচক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু শেয়ার না করা। যে কন্টেন্টে কোনো কল্যাণ নেই, তা শেয়ার করার কোনো প্রয়োজন নেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অনর্থক বিষয় ছেড়ে দেওয়া মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
তৃতীয়ত, প্রতারণামূলক পোস্ট না দেওয়া। লাইক, কমেন্ট বা ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেকে ভুল শিরোনাম বা বানোয়াট তথ্য দিয়ে পোস্ট করেন, যা স্পষ্টত প্রতারণা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)
চতুর্থত, এক্সপোজের নামে অন্যের দোষ প্রচার না করা। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)। একইভাবে ‘ফ্লেক্স’ অর্থাৎ নিজের সম্পদ, সাফল্য বা ইবাদত প্রদর্শন করা থেকেও বিরত থাকতে হবে, কারণ মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো কাজ করাই হলো রিয়া। হাদিসে এসেছে, যে মানুষকে শোনানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার আসল অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন, আর যে দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার আসল অবস্থা দেখিয়ে দেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৯)
পঞ্চমত, কমেন্টে গালাগালি বা কটুকথা না বলা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি (পাপাচার)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮)। বাস্তবে কাউকে গালি দিলে যে পাপ হয়, কমেন্টে গালি দিলেও ঠিক সেই পাপই হয়।
ষষ্ঠত, ভাইরাল কোনো কন্টেন্ট দেখলে আগে তা যাচাই করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)। মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তা-ই বলে বেড়ায়। (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৫)। যদি যাচাই করা সম্ভব না হয়, তবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে এবং তা শেয়ার করা যাবে না।
সবকিছুর প্রতিবাদ কি ফেসবুকে করা উচিত?
যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদের সঠিক জায়গা ফেসবুক নয়। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলার অর্থ এই নয় যে সব বিষয়েই মতামত দিতে হবে। কোনো কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এতে বাস্তব জীবনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে এবং কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
যেকোনো ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো অন্যায় বা অপরাধ দেখলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোই আমাদের যথাযথ দায়িত্ব। কারও অন্যায় সম্পর্কে জানলে তাকে সরাসরি সতর্ক করা যায়, কিংবা যাদের জানালে কাজ হবে তাদের জানানো যায়। কিন্তু নিজের ওয়ালে তার বিরুদ্ধে পোস্ট দিলে লাভের সম্ভাবনা কম, বরং এতে তার দোষ প্রচার হয়, যা অনুচিত।
হাদিসে অন্যায় দেখলে তা হাত দিয়ে, না পারলে মুখ দিয়ে বদলানোর কথা বলা হয়েছে, আর তা-ও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)। অর্থাৎ উদ্দেশ্য হতে হবে অন্যায় বন্ধ করা, শুধু প্রচার করা নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তারা যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে তার দায় আমাদের ওপর থাকবে না। কারণ আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মূলত যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান ও অনলাইন কেনাকাটার মতো কল্যাণকর কাজের জন্য। এটি যেন পাপ বা অপরাধের মাধ্যম না হয়ে ওঠে। মুমিনের প্রতিটি কাজ কল্যাণকর হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। কারণ কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)
—নাজমুস সাকিব: আলেম ও এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়