মাদক গ্রহণের অভিযোগে ৮৫ জন ব্যক্তিকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে, অথচ তাঁরা প্রকৃতপক্ষে মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হয়নি। ঢাকার ভাটারায় পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আটক ব্যক্তিদের এভাবে সাজা দেওয়ার ঘটনাটি ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তাবলি লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ওই বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। আটককৃত ২৬ জন নারীকে ১৫ দিন করে এবং পুরুষদের এক মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি তাঁদের জরিমানা করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন শিল্পীও রয়েছেন, যিনি ওই বাড়িতে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজে গিয়েছিলেন বলে তাঁর বাবা দাবি করেছেন।
পুরো ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো, মাদক পরীক্ষা করা হয়নি—এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিজেও স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “আসামিরা দোষ স্বীকার করায় সাজা দেওয়া হয়েছে।” তবে আটক ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন; তাঁদের দাবি, মুচলেকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের একটি সুষ্ঠু নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
জরিমানা আদায়ের নথিতে যে আইনি বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে মাদক গ্রহণ করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিনষ্ট করা বা বিরক্তিকর আচরণের কথা বলা হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, প্রত্যেক ব্যক্তি নেশাগ্রস্ত ছিলেন তার প্রমাণ কী? কার আচরণে কীভাবে জনশান্তি বিঘ্নিত হয়েছিল? বাড়িতে কয়েকটি মদের বোতল ও অন্যান্য মাদক উদ্ধারের দাবি উঠলেই যে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকের মাদক গ্রহণ প্রমাণিত হয়, তা নয়। উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের সঙ্গে কার কী সংশ্লিষ্টতা ছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল।
অভিযানটির স্বচ্ছতা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। তল্লাশির আগে সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নেওয়া এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ কেন সামনে এল? ওই ক্যামেরার মেমোরি কার্ড এখন কোথায় এবং জব্দের তালিকায় তার উল্লেখ নেই কেন? অভিযানের প্রকৃত বিবরণ জানতে এই ফুটেজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। তাই সংশ্লিষ্ট সব ডিজিটাল প্রমাণ, জব্দের তালিকা এবং স্বীকারোক্তির নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো তথ্য যেন নষ্ট বা পরিবর্তিত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আটক ব্যক্তিদের দুটি কক্ষে জড়ো করে ভিডিও ধারণ এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের। অপরাধের তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এবং জনসমক্ষে কাউকে অপমান করার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কারও চেহারা ও পরিচয় এভাবে প্রকাশ করে তাঁর পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক মর্যাদার যে ক্ষতি করা হয়, তা পরবর্তী প্রতিকারের মাধ্যমেও সহজে মুছে ফেলা সম্ভব হয় না।
এমতাবস্থায় সরকারের উচিত দ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা। একইসঙ্গে দণ্ডিত ব্যক্তিদের দণ্ডাদেশ পর্যালোচনা করা এবং তাঁদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি প্রমাণ ছাড়া বা অনিয়মের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা বাতিল করে অবিলম্বে মুক্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে হবে যথাযথ প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। নাগরিকের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে পরিচালিত কোনো অভিযান কখনোই সাফল্যের নজির হতে পারে না।