জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘একটা দাবিও আমাদের কোনো দলীয় দাবি না। সব কটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। সাত দফা যদি দাবি মেনে নেন, এক দফা দাবির প্রয়োজন হবে না; কিন্তু সাত দফা না মানলে এক দফা অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই এক দফার ডাক আমরা দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, অধিকার রক্ষার স্বার্থে দিতে বাধ্য হব।’

শনিবার রাতে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠে ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সাত দফা দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচির সমাপনী সভায় প্রধান অতিথির capacity-তে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমির। লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়ে জোটের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়ে তিনি শনিবার রাত ১১টা ৩৩ মিনিটে স্টেডিয়ামের মঞ্চে উপস্থিত হন। রাত ১১টা ৪৮ মিনিটে তাঁর বক্তব্য শুরু হয় এবং মাত্র ৬ মিনিট কথা বলেন তিনি।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, আপনাদের মূল্যবান ভোটে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, অনুরূপভাবে একটা সংস্কার পরিষদও গঠন করা হবে। তারা সংসদে বসেই তার ফায়সালা করবে; কিন্তু কায়দা করে, ইঞ্জিরিয়ারিং করেই তারা দুই– তৃতীয়াংশের বেশি সিট দখল করে নিয়েছে। এ জন্য তারা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।’

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, ইতিহাসে যখনই জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য, অপমান করা করা হয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। ঢাকা থেকে লংমার্চ করে কুষ্টিয়ায় এসেছি। যদি এক দফার প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যাওয়া লাগে, আপনারা কি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। টাকাপয়সা লাগবে, খাবার লাগবে? আমাদের কাছে বিরিয়ানি নাই। টাকা পয়সা দিতে পারব না। আমরা কথা দিচ্ছি জনগণের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে যদি জীবন যায়, তবুও অন্যায়ের কাছে আমরা মাথা নত করব না। আপনারা প্রস্তুত হন।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মুহসিন এবং সেক্রেটারি এনামুল হকের সঞ্চালনায় তিনি বলেন, ‘আমরা চাইনি এই আট মাসের মধ্যে আন্দোলনে আসতে হবে। কিন্তু কেন আসতে হলো। সেটা বিএনপির নেতারা বোঝেন না। আপনারা যদি আট মাস না যেতেই জনগণের ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারেন, গাদ্দারি করতে পারেন, বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, দুর্নীতি করে, লুটপাট করে শেষ করে দিচ্ছেন। একেবারে সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত দলীয়করণ, সারের একেকটা ডিলারশিপ দিতে ১২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশকে আর কোনোদিন অন্য কোনো রাজ্যের, অন্য কোনো রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতে দেব না ইনশা আল্লাহ। সাত দফা নিয়ে কুষ্টিয়ায় এসেছি। যদি সরকারের কাছে কোন আশানুরূপ কিছু না পায়, তবে যেকোনো মুহূর্তে ৭ দফা এক দফায় পরিণত হবে। এক দফার ডাক এলে ঢাকার দিকে মার্চ করতে কারা কারা প্রস্তুত থাকবেন হাত উঁচু করেন। বাংলাদেশে আর কারও বাপ–দাদার তালুকদারি প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া আর হবে না ইনশা আল্লাহ। জনগণের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’

অন্যদিকে কর্নেল অলি আহমদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছি সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এবং সেখানে সুশাসন থাকবে। মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে, সুবিচার থাকবে; কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি পাচ্ছে না। তাহলে বিগত সরকার আর এই সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিভিন্ন জায়গায় দলীয়করণ, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে হবে। উত্তরণ করার জন্য আপনাদের আরও কষ্ট করতে হবে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি।’

সমাবেশে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল হান্নান মাসউদসহ এনসিপি, এবি পার্টি, জাগপা, লেবার পার্টি, ছাত্রশিবিরসহ ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা বক্তব্য প্রদান করেন।

শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া রুটে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এই বহর হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর, ঝিনাইদহ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে রাত ১১টার দিকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছায়। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রাপথে ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হয় এবং পথে একাধিক পথসভা আয়োজন করা হয়। রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে লংমার্চের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১-দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের পর আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।