সরকার এবং ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এই ব্রিফিংয়ের আগে একই স্থানে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড, আহত, পঙ্গুত্ববরণসহ নানা ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃশ্যমান বিচার এখনো হয়নি। কিছু রায় হয়েছে, কার্যকর হয়নি। বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে আবার নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে।”
বৈঠক শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির গোপন সমঝোতার বিষয়টি সামনে আনেন সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি দাবি করেন, বিএনপির বেশ কিছু নেতা সংসদীয় নির্বাচনে তাঁদের দলের প্রাপ্ত ভোটের ৩০ শতাংশই মূলত আওয়ামী লীগের ভোট বলে উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। এমনকি শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথনের ভেতরেও এই সংক্রান্ত তথ্য বিদ্যমান রয়েছে। তাঁর দাবি, “থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার ভয়ে বিএনপি এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ করছে না।”
অন্যদিকে, ১১-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের বিষয়ে সরকারের যে অভিযোগ, তাকে ভুয়া ও অসত্য বলে অভিহিত করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, সরকারের কাছে যদি এ বিষয়ে কোনো প্রকৃত গোয়েন্দা তথ্য থেকে থাকে, তবে তা প্রকাশ করা উচিত। তাঁর দাবি, সরকার মূলত গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা নির্দিষ্ট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক কথা বলছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এই রিপোর্ট যে আপনারা বানিয়ে দিয়েছেন—এটা বুঝতে আমাদের আর দেরি নাই।”
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যে দাবি, তার তীব্র সমালোচনা করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে খুন, মাদক, ঘুষ, কালোবাজারি ও দুর্নীতির প্রকোপ বেড়েছে। তিনি দাবি করেন, গত ছয় থেকে সাত মাসে দলীয় কোন্দলের কারণে ক্ষমতাসীন দলেরই ৪০ জন কর্মী নিজেদের দলের লোকজনের হাতে খুন হয়েছেন। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তবে তিনি জানান, সেখানে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মতো কারচুপির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে তাঁরা খবর পেয়েছেন। এ ধরনের কোনো চেষ্টা করা হলে সরকারকে তার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেন তিনি।
আযাদ বলেন, “মাগুরার নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়, একটি দৃষ্টান্ত। এখান থেকে সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। সরকার যদি ক্ষমতায় থাকতে না চায়, তাহলে তারা জোর করে ক্ষমতায় রাখতে পারবেন না।”
বিরোধী দল ঠাকুরগাঁওয়ে মাগুরার উপনির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের যদি কোনো অশুভ পরিকল্পনা থাকে, তবে তারা যেন তা থেকে সরে আসে। যদি নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা করা হয়, তবে তা রুখতে ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
খুলনামুখী লংমার্চ গোপালগঞ্জ হয়ে যাওয়ার পথে কোনো ধরনের হামলার আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “আমরা সরকারের জিম্মাদারির কথা এখানে স্মরণ করিয়েছি। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের, রাষ্ট্রের। দেশে একটা সরকার আছে, এটা দেখার দায়িত্ব তাদের।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের কাজ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আযাদ বলেন, “ভাগ–বাঁটোয়ারার জায়গায় ওনারা এক। যেহেতু ভোটের সুবিধা নিয়েছেন, তাহলে উন্নয়নের সুবিধা, ব্যবসার সুবিধা দেবেন, এটাই স্বাভাবিক।”
ব্রিফিং চলাকালীন কওমি ঘরানার সাত ইসলামি দলের ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়ে জামায়াতের প্রতিক্রিয়া জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে আযাদ জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই ঐক্য অটুট থাকবে।
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, আগামী ৩১ অক্টোবর সকাল সাতটায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এরপর মাদারীপুর-শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে কুষ্টিয়া জেলা হাইস্কুল মাঠে এক সমাপনী সমাবেশের মাধ্যমে এই কর্মসূচি শেষ হবে।
এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ।