প্রবীণ নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও ভালো রাখার জন্য তাঁদের একাকিত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্য অর্জনে পরিবারের ভালোবাসা ও সান্নিধ্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবীণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেনস ওয়েলফেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা তরুণ প্রজন্মের সাথে প্রবীণদের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, প্রবীণ ব্যক্তিরা সমাজের অমূল্য সম্পদ। তাই তাঁদের অবদান ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে দেশের তিনজন বিশিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন— জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি চিকিৎসক এ কে আজাদ খান, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং কৃষিবিজ্ঞানী জহুরুল করিম।
সম্মাননা recipient চিকিৎসক এ কে আজাদ খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সমাজের সম্পদ। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রবীণদের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের ভালো থাকার জন্য শুধু অর্থসম্পদ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারের ভালোবাসা, সন্তানদের সান্নিধ্য ও মানসিক সমর্থন।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার পাশাপাশি নারী ও শিশুবান্ধব সমাজও গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সব বয়সী মানুষের প্রতি সহমর্মিতার মনোভাব প্রয়োজন।
তিনি প্রবীণদের করুণার পাত্র হিসেবে না দেখে ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে দেখার আহ্বান জানান। তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান বাড়ানোর কথা বলে তিনি উল্লেখ করেন, এতে দুই প্রজন্মই উপকৃত হবে।
প্রবীণ বয়সে একাকিত্বের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “প্রবীণদের ভালো থাকার জন্য শুধু অর্থসম্পদ যথেষ্ট নয়। অনেকের অর্থ ও সম্পদ থাকলেও তাঁরা একাকিত্বে ভোগেন। তাঁদের প্রয়োজন পরিবারের ভালোবাসা ও সন্তানের সান্নিধ্য। আবার অনেক প্রবীণের দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাঁদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও জরুরি।” এছাড়া প্রবীণদের বয়সজনিত নানা জটিলতার চিকিৎসায় দেশে বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক (বয়সজনিত চিকিৎসা) সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
কৃষিবিজ্ঞানী জহুরুল করিম নিজেকে কৃষকের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে কৃষির জন্য কাজ করতে পেরে গর্বিত বলে জানান। তিনি বলেন, জীবনের বড় একটি সময় কৃষির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। দেশের অগ্রগতিতে প্রবীণদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তাঁদের জন্য এখনো দেশে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। প্রবীণদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে সমাজের জন্য কাজ করার সুযোগও তাঁদের দিতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রবীণদের নিয়ে সোসাইটির কার্যক্রম শুধু শহরে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামেও ছড়িয়ে দিতে হবে।
পুরো অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এ কে এম রেজাউল হক। তিনি প্রবীণদের দেওয়া এই সংবর্ধনাকে ‘আলোকিত মানুষের সংবর্ধনা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে অনেক উন্নয়ন হলেও প্রবীণদের ভালো রাখার উদ্যোগে সংশ্লিষ্টদের ঘাটতি ও অদক্ষতা রয়ে গেছে। পরিশেষে তিনি প্রবীণদের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।