বাজার থেকে পেঁপে কেনার পর অনেক সময় দেখা যায়, বাইরে থেকে পাকা মনে হলেও ভেতরে তা মিষ্টি নয়। এমন হতাশাজনক অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট কৌশল জানলে এবং সতর্কতার সাথে যাচাই করে পেঁপে কিনলে ঠকার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। জেনে নিন, সুস্বাদু ও মিষ্টি পেঁপে বেছে নেওয়ার ৭টি কার্যকর উপায়।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ পেঁপে একটি বারোমাসি ফল, যা সারা বছরই বাজারে পাওয়া যায়। হজমের সমস্যা দূর করা থেকে শুরু করে ত্বকের যত্নে এই ফলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এমনকি অসুস্থ রোগীদের পথ্য হিসেবেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। অন্যান্য ফলের তুলনায় এর দামও বেশ হাতের নাগালে। তবে বাজার থেকে কেনা পেঁপে যদি পানসে হয়, তবে তা স্বাদে ও তৃপ্তিতে ব্যর্থ হয়।
এই বিষয়ে অভিজ্ঞ ফল বিক্রেতা মিজান মিয়ার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা মিজান দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আগারগাঁও তালতলা এলাকায় ফল বিক্রি করছেন। নিজের দোকানের পেঁপে হাতে নিয়ে তিনি ভালো মানের মিষ্টি ও পাকা পেঁপে চেনার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রথমত, রঙের দিকে নজর দিতে হবে। পুরোপুরি সবুজ রঙের পেঁপে কখনোই পাকা হবে না। কেনার সময় খেয়াল করুন পেঁপের গায়ে হলুদ কিংবা লালচে আভা আছে কি না। বিক্রেতাদের ভাষায় একে বলা হয়, ‘শির পাকা পেঁপে’। পেঁপের গায়ে হালকা খাঁজকাটা দাগ থাকে এবং পরপর দুটি খাঁজকাটা দাগের মাঝের উঁচু অংশটিই হলো শির। এই অংশ থেকেই মূলত পাকা ভাব শুরু হয়।
দ্বিতীয়ত, যে পেঁপের গায়ে গাঢ় হলুদ বা হলদে-কমলা রং ছড়িয়ে থাকে, সেটি বেছে নেওয়া উচিত। যদি হালকা সবুজাভ ভাব থাকে, তবে বুঝতে হবে এটি আরও দু-এক দিনের মধ্যে পেকে যাবে; এমন পেঁপেও কেনা যেতে পারে। তবে পেঁপের গায়ে যদি সমানভাবে রং ছড়িয়ে থাকে, তবে সেই পেঁপে নেওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
তৃতীয়ত, স্পর্শ করে পরীক্ষা করা। পেঁপে কেনার সময় বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে দেখুন। যদি পেঁপেটি অতিরিক্ত শক্ত মনে হয়, তবে বুঝতে হবে এটি কাঁচা অথবা গাছে পুরোপুরি না পাকতেই তোলা হয়েছে। আবার যদি অতিরিক্ত নরম হয় বা আঙুল ভেতরে দেবে যায়, তবে সেটি বেশি পেকে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি হালকা নরম পাকা পেঁপে কেনা হয়, যা আঙুলের চাপে সামান্য বসে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।
চতুর্থত, বোঁটার অবস্থা যাচাই করা। পেঁপের বোঁটা বা বোঁটার চারপাশের অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোঁটার চারপাশ যদি কিছুটা খাঁজকাটা এবং লালচে-হলুদ রঙের হয়, তবে সেই পেঁপে মিষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বোঁটার কাঁচা অংশ বা খুব বেশি সাদা কষ জমে থাকলে তা না কেনাই ভালো। গাছপাকা পেঁপের গায়ে সাধারণত খুব বেশি সাদা কষ দেখা যায় না। যদি পেঁপের শরীরজুড়ে অতিরিক্ত সাদা আঠা জমে থাকতে দেখেন, তবে বুঝে নেবেন এটি নির্ধারিত সময়ের আগেই গাছ থেকে পেড়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে।
পঞ্চমত, ঘ্রাণ পরীক্ষা। পাকা পেঁপের একটি বিশেষ মিষ্টি ও হালকা সুবাস থাকে। পেঁপের বোঁটার কাছাকাছি ঘ্রাণ নিয়ে দেখুন। যদি হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ পান, তবে নিশ্চিত হতে পারেন পেঁপেটি সুস্বাদু ও পাকা। কিন্তু যদি কোনো ঘ্রাণ না থাকে অথবা অতিরিক্ত ঝাঁজালো বা পচা গন্ধ নাকে আসে, তবে তা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ষষ্ঠত, বাহ্যিক দাগ পর্যবেক্ষণ। পেঁপের গায়ে খুব বেশি কালচে দাগ বা ছোট ছোট ছিদ্র থাকলে তা না কেনাই ভালো। কারণ, এটি ভেতরে পোকা থাকা বা পচে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। তবে খুব সামান্য দাগ থাকলে তাতে সমস্যা নেই।
সপ্তমত, আকার ও আকৃতি। জাতভেদে পেঁপের আকার ও আকৃতি ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। তবে একই জাতের পেঁপের মধ্যে তুলনামূলক চিকন টাইপের পেঁপে বেছে নিন। আকারে মোটা পেঁপের ভেতরটা অনেক ক্ষেত্রে ফাঁপা থাকে এবং বীজের পরিমাণ বেশি থাকায় ওজনও বেশি হয়। তাই মাঝারি ও চিকন আকারের পেঁপে কেনাই শ্রেয়।
জাতভেদেও পেঁপের স্বাদে ভিন্নতা দেখা যায় এবং কোন অঞ্চল থেকে আসছে তার ওপর মিষ্টতা নির্ভর করে। মিষ্টতার দিক থেকে সবার আগে আসবে থাই রেড লেডি পেঁপে, যার ভেতরটা আগুনের মতো লাল। এরপর শাহি পেঁপেসহ দেশি জাতের মিষ্টি পেঁপে। দেশের সবচেয়ে ভালো মিষ্টি পেঁপে পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর এবং নওগাঁ জেলা থেকে।
সবশেষে, ভেজালের দুশ্চিন্তা এড়িয়ে তরতাজা পেঁপে খেতে চাইলে নিজেই চাষ করার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। রোদ পায় এমন বাসার বারান্দা বা ছাদে এটি করা সম্ভব। এই বিষয়ে কথা হয়েছে ১০ বছর ধরে শাহি জাতের পেঁপে চাষ করা দিনাজপুরের জুলহাশ আহমেদ রুবেলের সঙ্গে। ‘রুবেল মিয়ার পেঁপে চাষ’ নামের একটি বইও লিখেছেন তিনি।
তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, বারান্দা বা ছাদে বড় টব, জিও ব্যাগ, হাফ ড্রাম বা বেডে সহজেই পেঁপে চাষ করা যায়। ভার্মিকম্পোস্ট সার যোগে বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে টব ভর্তি করে চারা রোপণ করা সম্ভব। নিয়মিত পানি ও জৈব সার প্রয়োগ করলে ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই নিজের লাগানো গাছেই পেঁপের দেখা পাওয়া যাবে।