কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এক অদ্ভুত চিত্র সামনে এসেছে। মোট ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। এই তালিকায় নোয়াখালী জেলার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে বেগমগঞ্জ আপার মডেল কলেজ। তবে ফলাফল প্রকাশের পর যখন কলেজটির খোঁজ নেওয়া হয়, তখন দেখা যায় নির্ধারিত ঠিকানায় কোনো ক্যাম্পাস নেই। এমনকি স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নন।

মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কলেজটির দেওয়া একাধিক ঠিকানায় গিয়েও কোনো সাইনবোর্ড বা ক্যাম্পাসের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের লিফলেটে উল্লিখিত মুঠোফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি।

অনুসন্ধান চলাকালীন কলেজটির প্রথম ঠিকানা হিসেবে পাওয়া যায় বেগমগঞ্জের কন্ট্রাক্টরের মসজিদ এলাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলছে। এরপর চৌমুহনী পূর্ব বাজারের কেএইচ টাওয়ারের মণ্ডল পাড়ায় এবং চৌমুহনী কলেজ গেটের পাশে খোঁজ নেওয়া হলেও কলেজটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

লিফলেটে দেওয়া নম্বরগুলোর একটিতে যোগাযোগ করলে স্বপন নামের এক ব্যক্তি জানান, পাঁচ বছর আগে তিনি কলেজটির দায়িত্বে ছিলেন, তবে বর্তমানে আর নেই।

পরবর্তীতে রফিকুল আলম রুবেল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কলেজটির কাগজপত্র দেখাশোনার কাজে তিনি যুক্ত। তিনি আরও জানান, তাকে অধ্যক্ষ করার জন্য গভর্নিং বডি প্রস্তাব দিয়েছিল এবং সেই প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছর এই কলেজ থেকে পাঁচজন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের কেউই পাস করতে পারেননি।

ক্যাম্পাস নেই, নেই স্থায়ী শিক্ষকও

কলেজের ক্যাম্পাস কোথায়—এই প্রশ্নের জবাবে রুবেল জানান, বর্তমানে তাদের কোনো ক্যাম্পাস নেই। আগে চৌমুহনী কলেজের পাশে একটি কক্ষে কলেজের কার্যালয় ছিল, তবে এখন সেটিও নেই।

তিনি আরও জানান, চৌমুহনী গণিপুর গার্লস একাডেমির সামনে একটি ভবন ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে ভবনটির নিচে ফুচকার দোকান থাকায় সেখানে জায়গা নেওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, তাই অন্য কোথাও কক্ষ খোঁজা হচ্ছে।

কলেজের অধ্যক্ষ কে—জানতে চাইলে রুবেল বলেন, বর্তমানে কোনো অধ্যক্ষ বা স্থায়ী শিক্ষক নেই। তবে তিনি দাবি করেন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে ক্লাস নেন। যদিও তিনি তাদের নাম জানাতে পারেননি।

রুবেলের দাবি, ২০১৩ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর সেখানে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন এবং তাদের অনেকে এখন চিকিৎসক। বর্তমানে কলেজটিতে ৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন, যদিও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করেন না। প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষা চৌমুহুনীর একটি মাদ্রাসায় হয় বলে তিনি জানান, তবে মাদ্রাসাটির নাম বলতে পারেননি।

দায়িত্বে থাকার কথা অস্বীকার নূরনবীর

রুবেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলেজটি তিনজন মিলে পরিচালনা করেন। তাদের একজন নূরনবী, যিনি চৌমুহনী কলেজ রোডে প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসা করেন। অন্যজন আফাজ উদ্দিন এবং তৃতীয়জন রুবেল নিজে, যিনি কাগজপত্র দেখাশোনা করেন।

তবে নূরনবীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি কলেজটির কোনো দায়িত্বে নেই। বর্তমানে কে দায়িত্বে আছেন, সে বিষয়েও তার কোনো ধারণা নেই। অন্যদিকে, আফাজ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

কলেজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ শিক্ষা কর্মকর্তার

বেগমগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “উপজেলায় এ নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব আছে বলে আমার জানা নেই। গত তিন-চার বছরেও প্রতিষ্ঠানটির কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কলেজগুলো সরাসরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমার সন্দেহ রয়েছে।”

বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার রহমান জানান, এ নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে তিনি জানেন না। তিনি ধারণা করছেন, অন্য কোনো কলেজের হয়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে থাকতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে অনুমোদন পেল, তা খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি নিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নোয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, “এই প্রথম শুনলাম, এমন একটি কলেজ নোয়াখালীতে আছে। শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এত বড় একটি অনিয়ম সামলে কীভাবে একটি কলেজ চলে, ভাবতে অবাক লাগে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নোয়াখালীতে পাসের হার ৩৮.৯০ শতাংশ

এ বছর নোয়াখালী জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ১৬ হাজার ২৩৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ হাজার ৩১৭ জন। জেলায় পাসের হার ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১১২ জন শিক্ষার্থী।