দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগামীকাল ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সাড়ে চার মাস দ্বীপে যাতায়াতের পাশাপাশি রাতযাপনের সুযোগ পাবেন পর্যটকেরা। তবে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যটকদের ভ্রমণের সময় শুরু হলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে না। ফলে দ্বীপে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া পর্যটকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এদিকে পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর্যটকনির্ভর ব্যবসা বন্ধ বা সীমিত থাকায় আর্থিক সংকটে পড়া স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পর সেন্টমার্টিনের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাহাজ চলাচলে অনুমোদনের অপেক্ষা

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীকাল ১ নভেম্বর থেকে পর্যটক পরিবহন শুরুর কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে না। এ রুটে চলাচলের জন্য এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেও বিআইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অনুমোদন পায়নি।

সেন্টমার্টিনগামী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, পর্যটক পরিবহনের জন্য তিনটি জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন। গত বৃহস্পতিবার সকালে জাহাজগুলো চলাচলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভয়েজ লাইসেন্স এখনো পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট ও চলাচলের সময়সূচিও ঘোষণা করা হয়নি। এ ছাড়া কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের স্থানীয় অনুমোদনও বাকি রয়েছে।

হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আরও বলেন, পর্যটকেরা টিকিট বুকিং দিতে আগ্রহী হলেও ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাস-সংক্রান্ত সফটওয়্যার এখনো চালু হয়নি। এসব জটিলতা দ্রুত কাটলে আগামী ৫ বা ৬ নভেম্বরের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।

আগের মতোই কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়ায় বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে বলে জানান তিনি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় এখনো কোনো জাহাজকে সেন্টমার্টিনে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ট্যুরিজম বোর্ডের প্রস্তুতিও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে জেলা প্রশাসক ৪ নভেম্বর সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সাড়ে চার মাস রাতযাপনের সুযোগ

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। তবে সেখানে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা বহাল রাখা হয়।

ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় দ্বীপে গিয়ে একই দিন ফিরে আসার কথা ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ছিল রাতযাপনের সুযোগ। ফলে এবারও নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চে রাতযাপন করা যাবে কি না, তা নিয়ে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে সেই বিভ্রান্তি দূর করা হয়। এতে ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো সময় পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান সাংবাদিকদের বলেন, নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা সংশোধন করা হয়েছে। নির্ধারিত পুরো সময়েই পর্যটকেরা দ্বীপে থাকতে পারবেন।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, গতবারের মতো এবারও পর্যটকদের ট্রাভেল পাস নিয়ে দ্বীপে যেতে হবে। এ জন্য কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।

বহাল থাকছে যেসব বিধিনিষেধ

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আগের বছরের প্রজ্ঞাপনে আরোপিত বিধিনিষেধগুলো এবারও বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও করা যাবে না।

এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ থাকবে।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে সেন্টমার্টিনের আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ পর্যটকের প্রাণহানির পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেন্টমার্টিনেও সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াবুল করিম বলেন, দ্বীপের কোনো হোটেল, রিসোর্ট বা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে অনেক সময় বাড়িতে ব্যবহৃত পানির পাইপ দিয়ে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। কিন্তু আগুন বড় আকার ধারণ করলে সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেক বাসিন্দা মোস্তাক আহমেদ বলেন, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দিলেই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এসব যন্ত্র কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করতে হবে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা হয়েছে। হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।

টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, তিনি সম্প্রতি টেকনাফে যোগ দিয়েছেন। সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও প্রশিক্ষিত কর্মী রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্বীপটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘ এক বছর পর পর্যটকদের জন্য দ্বীপে যাতায়াত ও রাতযাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একসময় দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। তবে গত দুই দশকে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে থাকায় অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও সেবামূলক কাজে যুক্ত হন।

পর্যটকদের যাতায়াতে বিধিনিষেধের কারণে গত এক বছরে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা দেয়। এবার নতুন সিদ্ধান্তে এসব ব্যবসা আবার সচল হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের সব পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার ও পর্যটকদের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যস্ত রয়েছেন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। ১ নভেম্বর থেকে দৈনিক সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ কাজ করছে।