টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা এই দ্বীপে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। তবে দ্বীপে রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় পর্যটক, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক এবং জাহাজমালিকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
হোটেল ও পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের দাবি, আগামী চার মাসের বেশি সময় পর্যটকেরা দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তা এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, পর্যটকের সংখ্যা ও ভ্রমণের সময়সীমা বাড়ানো হলেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে আগের সিদ্ধান্তই বহাল থাকতে পারে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকদের সকালে সেন্ট মার্টিনে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসতে হবে এবং ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত রাতযাপনের সুযোগ থাকবে।
হোটেলমালিকদের আশঙ্কা, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে। সাধারণত এই সময়ে কক্সবাজারে পর্যটকের আনাগোনা কমে যায়, ফলে রমজান মাসে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকতে পারে। এমনটি হলে পর্যটকেরা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ১৫ দিন বেশি দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত শুরুর খবরে স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্ছ্বসিত। ইতিমধ্যে দ্বীপের ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ পর্যটকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক এলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে।”
রাতযাপন নিয়ে বিভ্রান্তির সূত্রপাত হয় ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর। ওই সভায় ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত রোববার মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমানের সই করা নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন এবং প্রত্যেককে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে ১০০ টাকা প্রদান করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ২৬ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলো বহাল রাখা হয়েছে। তবে নতুন এই নির্দেশনায় পর্যটকদের রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত বছর সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপটি উন্মুক্ত করা হলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ওই মাসে পর্যটকেরা যেতে পারেননি। নভেম্বরে রাতযাপনের সুযোগ ছিল না; কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস পর্যটকেরা রাতযাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন।
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রোববারের প্রজ্ঞাপনে রাতযাপনের বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পুরো সময় রাতযাপনের সুযোগ না থাকলে ব্যবসায়ীরা হতাশ হবেন। তাঁদের প্রত্যাশা, পুরো পর্যটন মৌসুমেই দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ রাখা হবে।”
জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ না থাকলেও পুরো সময় পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিনে রাতযাপনের সুযোগ পাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। সে অনুযায়ী জাহাজ চলাচল ও টিকিট বিক্রির প্রস্তুতি চলছে।” তিনি আরও জানান, গত বছর কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন সমুদ্রপথে নয়টি জাহাজ চলাচল করেছিল, এবার জাহাজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন। তিনি বলেন, “নতুন প্রজ্ঞাপনে রাতযাপনের বিষয়ে উল্লেখ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হবে।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সেন্ট মার্টিনে রাতযাপনের বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি। আগের প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলো বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার কক্সবাজারে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জাহাজমালিক, হোটেল-রেস্তোরাঁমালিক এবং ট্যুর অপারেটররা উপস্থিত থাকবেন। সবার মতামতের ভিত্তিতে রাতযাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসক আরও জানান, সোমবার দুপুর পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে জাহাজ চলাচলের কোনো আবেদন জমা পড়েনি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজকে পর্যটক নিয়ে দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, “প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক গেলে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটক যাতায়াত বন্ধ রাখা, সৈকতের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করা এবং নভেম্বর মাসে রাতযাপনের সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে তিনি মত দেন।”
সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের কঠোর বিধিনিষেধ মানতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “৯ মাস পর্যটক যাতায়াত বন্ধ থাকায় দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশের উন্নতি হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে যাওয়া পর্যটকদের সরকার নির্ধারিত ১২টি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।”
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে; কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।
দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ এবং পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সরকারি বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বন্ধে নজরদারি থাকবে। পর্যটকেরা বিধিনিষেধ মানছেন কি না, তা তদারক করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে কক্সবাজার এবং সেন্ট মার্টিনে পৃথক দুটি দল কাজ করবে।
এর আগে টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতেন। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নাফ নদীতে বাংলাদেশি নৌযানে গুলিবর্ষণ ও অপহরণের ঘটনায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গত দুই বছর ধরে কক্সবাজার থেকে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৯ মাস দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ ছিল।