দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের জন্য আরোপিত বিধিনিষেধের কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরের নিয়ম অনুযায়ী, পর্যটকরা ১ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপে যেতে পারতেন। তবে এবার সেই সময়সীমা ১৫ দিন বাড়িয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সেন্টমার্টিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে পর্যটকদের জনপ্রতি ১০০ টাকা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ফি’ প্রদান করতে হবে।
পর্যটকদের যাতায়াতের সংখ্যায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পেতেন, যা এবার বাড়িয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটকের করা হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরিনা রহমানের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে পর্যটকদের যাতায়াতে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ জন পর্যটক যাতায়াত করতে পারবেন, এর অধিক পর্যটকের যাওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি পর্যটকদের জনপ্রতি ১০০ টাকা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ফি’ দিতে হবে।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ব্যতিরেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না।” আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্টমার্টিন যাতায়াত করতে পারবেন। নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজসমূহের চলাচল অব্যাহত থাকবে।
আগের নির্দেশের পরিবর্তন
পূর্ববর্তী নির্দেশনায় পর্যটন মৌসুমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। নভেম্বর মাসে পর্যটকরা দিনে দ্বীপে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসতেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ ছিল এবং ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হতো।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ থাকছে। ফলে আগের বিধিনিষেধের তুলনায় পর্যটন মৌসুমের সময় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটকদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নৌযান চলাচলে নতুন নিয়ম
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজের চলাচল অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় মানতে হবে যেসব নিয়ম
সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত বছরের ১২ দফা নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বহাল রাখার কথা জানিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন না করা। এছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পর্যটকদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, পুলিশ সুপার (কক্সবাজার) এবং ট্যুরিস্ট পুলিশকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
নির্দেশনায় যত শর্ত
গত বছরের ২২ অক্টোবর জারি করা নির্দেশনার শর্ত অনুযায়ী, জাহাজের টিকিট কাটার সময় বা ভ্রমণের জন্য অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা ট্রাভেল পাস (কিউআর কোডযুক্ত) থাকা বাধ্যতামূলক। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নভেম্বর মাসে রাত্রি যাপন করা যাবে না; রাত্রি যাপনের সুযোগ পাওয়া যাবে ডিসেম্বর থেকে। দ্বীপে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক (প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল ইত্যাদি) বহন বা ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সমুদ্র সৈকতে রাতের বেলা আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ করা এবং যান্ত্রিক মোটরযান চালানো নিষিদ্ধ। পরিবেশ রক্ষার্থে ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকদের গমনাগমনের ওপর কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা থাকে।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর সেন্টমার্টিনে পর্যটন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়।