এক ম্যাচেই দুটি বিশাল সাফল্য অর্জন করল দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ট্রেলিয়াকে ১৭৬ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জেতার পাশাপাশি আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর স্থানটি দখল করল প্রোটিয়ারা।

প্রায় এক দশক পর টেস্ট ক্রিকেটে শীর্ষ দলের গৌরব ফিরে পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্যদিকে, সিরিজ হারের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখা শীর্ষস্থানটি হারাল প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া। কেপটাউনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট ১০ উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার এই ঐতিহাসিক জয়ের প্রধান নায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্পিনার সাইমন হারমার।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টের পঞ্চম দিনে জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রোটিয়াদের দেওয়া ২৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১১১ রানেই অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। এই ইনিংসে হারমার মাত্র ১৬ রান খরচ করে ৬ উইকেট শিকার করেন। অন্যদিকে কাগিসো রাবাদাও তিন উইকেট নেন। অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন হারমার।

এই জয়ের ফলে আইসিসি টেস্ট দলীয় র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটি পুনরায় ফিরে পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। সিরিজের আগে ১২৬ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে এক নম্বরে ছিল অস্ট্রেলিয়া এবং ১১৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। আইসিসি আগেই জানিয়েছিল, কেপটাউনে সিরিজ নির্ধারণী এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া পরাজিত হলে দুই দলের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটবে।

এর ফলে ২০১৬ সালের জানুয়ারির পর প্রথমবারের মতো টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে ফিরল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রায় ১০ বছর পর শীর্ষস্থান ফিরে পাওয়ার এই সাফল্যটি এসেছে এমন এক ম্যাচে, যেখানে প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকরা ১০০ রানে পিছিয়ে ছিল।

সিরিজ নির্ধারণী এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য ছিল ২৮৮ রান। কিন্তু পঞ্চম দিনের শুরুতেই রাবাদার বিধ্বংসী গতির সামনে ভেঙে পড়ে সফরকারীদের টপ অর্ডার। ইনিংসের প্রথম ওভারেই ম্যাট রেনশ ও মারনাস লাবুশেনকে ফিরিয়ে দেন এই পেসার। রানের খাতা খোলার আগেই ফিরে যান রেনশ এবং লাবুশেন করেন মাত্র ৪ রান।

এরপর ট্রাভিস হেডকেও সাজঘরে পাঠান রাবাদা। মাত্র ২২ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। কিছুক্ষণ পর ক্যামেরন গ্রিনের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে রানআউট হন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান জশ ইংলিস।

সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রাখেন হারমার। একে একে ফিরিয়ে দেন অ্যালেক্স ক্যারি, কুপার কনোলি ও মিচেল স্টার্ককে। প্রথম সেশনের শেষেই অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে মাত্র ৬০ রান।

এরপরও শেষদিকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিন করেন ২৭ রান এবং শেষদিকে অপরাজিত ৩৩ রান করেন নাথান লায়ন। তবে তাদের এই লড়াই পরাজয়ের ব্যবধান কমানো ছাড়া আর কোনো কাজে আসেনি। ৫৭.১ ওভারে ১১১ রানেই শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস।

হারমার মাত্র ১৬ রানে ছয় উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধটুকুও ভেঙে দেন। প্রথম ইনিংসেও চার উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে ১০ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সবচেয়ে সফল বোলার এই অফস্পিনার।

তবে শুধু হারমার নন, এই ম্যাচে ইতিহাস গড়েছেন রাবাদাও। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে তিন উইকেট নেওয়ার পথে টেস্ট ক্রিকেটে ৩৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। বলের হিসাবে সবচেয়ে দ্রুত ৩৫০ উইকেট নেওয়ার বিশ্বরেকর্ডও গড়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই পেসার।

মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ বল করে ৩৫০ উইকেট নিয়েছেন রাবাদা। এর আগে ১৪ হাজার ৭১৯ বলে এই মাইলফলক স্পর্শ করে রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকারই কিংবদন্তি পেসার ডেল স্টেইন।

এর আগে টেস্টের প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার ৩২৯ রানের জবাবে ৪২৯ রান করে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ১০০ রানের লিড পাওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল সফরকারীরা। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জশ ইংলিস ১০২, অ্যালেক্স ক্যারি ৮০ এবং ম্যাট রেনশ ৭৪ রান করেন।

তবে দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত ঘুরে দাঁড়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা। রায়ান রিকেলটন ও উইয়ান মুল্ডারের সেঞ্চুরিতে ৩৮৭ রান তোলে প্রোটিয়ারা। রিকেলটন ১০১ এবং মুল্ডার ১১৫ রান করেন। ষষ্ঠ উইকেটে তাঁদের ১৫৪ রানের জুটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ২৮৮ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। কিন্তু রাবাদা ও হারমারের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে সেই লক্ষ্য তাড়ার কোনো সুযোগই পায়নি সফরকারীরা।

তিন ম্যাচের সিরিজের শুরুটা অবশ্য হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার দাপটে। ডারবানে প্রথম টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১৪ রানে হারিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল কামিন্সের দল। এরপর গেবেখায় দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৩১ রানে জিতে সিরিজে সমতা ফেরায় স্বাগতিকরা।

শেষ পর্যন্ত কেপটাউনের সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।

এই জয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। কেপটাউনের ফলের পর অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্টের হার ৭৫ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকার হার ৬৬ দশমিক ৬৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশে।

ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৭২ দশমিক ২২ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় এবং অস্ট্রেলিয়া তৃতীয় স্থানে নেমেছে।

টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে হারিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে বড় বার্তাই দিল দক্ষিণ আফ্রিকা। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা আগামী আসরের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়েও নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করল।