গণভোটের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হলে এই আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে আরও কঠোর ও শক্তিশালী কর্মসূচির দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। এই লড়াইয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি জীবন চলে গেলেও জাতির সঙ্গে বেইমানি করবেন না তারা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুর ৩টায় সাত দফা দাবিতে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের অংশ হিসেবে খুলনার বাবরী চত্বরে একটি পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান জানান, তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। এই রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত একের পর এক আরও শক্তিশালী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জনগণের সাত দফা দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরই তারা আন্দোলন সমাপ্তির ঘোষণা দিতে চান।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই রায় অস্বীকার করা হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ভোটার গণভোটের পক্ষে মত দিলেও সংসদে দাঁড়িয়ে তা না মানার অবস্থান নেওয়া হয়েছে। জনগণের ভোটের রায় নিয়ে এমন অবস্থান মেনে নেওয়া হবে না। রায় বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বিলম্বও সহ্য করা হবে না।”
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, “আমরা এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের বিজয় ও মুক্তি চাই। শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য।”
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, কয়েকটি কার্ড বিতরণ করে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে সমাবেশে উপস্থিত কেউ কৃষক কার্ড বা অন্য কোনো সুবিধার কার্ড পেয়েছেন কি না, তা জানতে চাইলে উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার কার্ড দেওয়ার প্রচার চালানো হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও বিল দিতে হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ না পেলেও বিল আসছে; এভাবে জনগণের অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
কৃষি খাতের চরম দুরবস্থার কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কৃষক সার পাচ্ছেন না। অথচ নতুন করে সার ডিলার নিয়োগে ২০, ২৫ ও ৩০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে হইচই ও সংঘর্ষ হচ্ছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে, কিন্তু কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনসহ গত সাড়ে ১৫ বছরে যারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাদের বিচারের দাবিতে আমরা রাজপথে নেমেছি। আমরা প্রিয় হাদি হত্যারও বিচার চাই।” এছাড়া সরকারি দলের চাঁদাবাজদের হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করা, জনগণের অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার বন্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, এসব দাবি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের একক দাবি নয়, বরং দেশের প্রতিটি মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। জনগণ তাদের সঙ্গে রয়েছে এবং রাজপথে হাজার হাজার নারী-পুরুষের উপস্থিতি ও সমর্থন সেই বার্তাই দিচ্ছে।
প্রয়োজনে খুলনা থেকে ঢাকামুখী কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘর থেকে মানুষকে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১১ দলের বিজয় নয়, বরং তারা বাংলাদেশের জনগণের বিজয় চান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না তারা।
তিনি জানান, ঢাকার বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চটি ১১ দলীয় ঐক্যের তৃতীয় কর্মসূচি। এর আগে শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুর জেলা স্কুল মাঠ পর্যন্ত দুটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের কর্মসূচিটি কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। সমাবেশের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, “জুলুমবাজদের পতন হবে, জনগণের বিজয় হবে। এই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব।”
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির খুলনার আহ্বায়ক ও খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে এই পথসভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, এনসিপির আবদুল হান্নান মাসউদ, ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাসার, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কয়রা-পাইকগাছা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব।