বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে এক হতাশাজনক চিত্র সামনে এসেছে। বোর্ডের আওতাভুক্ত ছয়টি জেলার মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে ঝালকাঠি জেলা। জেলার চারটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন দুর্বল ফলাফলের ফলে শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ঝালকাঠি জেলা থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৪ হাজার ৬৯৯ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল। তবে তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৫৩ জন। অন্যদিকে, অকৃতকার্য হয়েছে ৩ হাজার ৪৬ জন শিক্ষার্থী। সামগ্রিকভাবে জেলায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশে। এছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৩৮ জন শিক্ষার্থী।

উপজেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ১ হাজার ৭৩৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬৮২ জন। নলছিটি উপজেলায় ১ হাজার ৫৯৮ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৫৪ জন। রাজাপুরে ৯৬৪ জনের মধ্যে পাস করেছে ২৬৮ জন এবং কাঁঠালিয়ায় ৩৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১৪৯ জন।

ফলাফলের এই চরম বিপর্যয়ের বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির বিষয়গুলো এখন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে, ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন হতাশাজনক ফলাফলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৩১ অক্টোবর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে দেওয়া এক সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তিতে তিনি এই পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

গণবিজ্ঞপ্তিতে কাঁঠালিয়া ও রাজাপুর উপজেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল তুলে ধরে তিনি বলেন, “শিক্ষার এমন নিম্নমান কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের মেধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময় এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মণ্ডলী, গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটি ও অভিভাবক সমাজকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন হতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “নিয়মিত ক্লাসের অভাব, নিবিড় তদারকির দুর্বলতা এবং দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য শিক্ষার্থীদের এমন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।” শিক্ষার পরিবেশ ও মান নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

গণবিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ফলাফল উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, কাঁঠালিয়া উপজেলার মনস্বিতা মহিলা ডিগ্রি কলেজে ৭৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪৬ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। আমুয়া শহীদ রাজা ডিগ্রি কলেজে ২৩১ জনের মধ্যে পাস করেছে ১১৭ জন। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সরকারি কলেজে ২২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১০ জন, যেখানে জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। পশ্চিম ছিটকী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে ২৫ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১২ জন।

অন্যদিকে রাজাপুর উপজেলার আলহাজ লালমোন হামিদ মহিলা ডিগ্রি কলেজে ২১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১২১ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন। বড়ইয়া ডিগ্রি কলেজে ২৮৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ৮৯ জন। রাজাপুর সরকারি কলেজে ১৬৪ জনের মধ্যে ৪২ জন এবং আব্দুল মালেক ডিগ্রি কলেজে ৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ বা দায় চাপানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।