ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কেওতা ঘিগড়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান। প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী ও ২৯ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামোর সংকটে। বর্ষায় ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়া ও পলেস্তারা খসে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘদিন ধরেই তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটি উপজেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে ২৯ শিক্ষক ও ছয় কর্মচারী আছেন। তবে শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষের অভাবে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্ভোগ চরমে ওঠে। বিজ্ঞান ভবনের ছাদে পলিথিন পেতে সাময়িকভাবে পানি ঠেকানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। পুরোনো ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ে টেবিল-চেয়ার, বেঞ্চ ও শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
শিক্ষার্থী নূর নাহার বলেন, "অনেক দিনের পুরোনো ভবন। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। এই ভবনে ক্লাস করতে আমাদের ভয় হয়। কখন আবার ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে, সেই আতঙ্ক থাকে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। আমরা একটি নতুন ভবন চাই, যাতে নিরাপদে ক্লাস করতে পারি।"
গণিত শিক্ষক অনিক আহম্মেদ বলেন, "শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান করতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ার কারণে ক্লাস পরিচালনাও ব্যাহত হয়। একটি নতুন একাডেমিক ভবন হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ অনেক ভালো হবে।"
তিনি আরও বলেন, "শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। পুরোনো ভবনের সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে একটি নতুন ভবন নির্মাণের বিকল্প নেই।"
আইসিটি শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, "প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা জরুরি। নতুন একাডেমিক ভবন হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয়ভাবে আইসিটি ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।"
তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভবন হলে এ মাদ্রাসার শিক্ষার মান আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।"
মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মোবাশ্বের হোসাইন বলেন, "প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো ভবনগুলো অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। পলিথিন দিয়ে কোনোভাবে পানি ঠেকিয়ে পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হলে শিক্ষার পরিবেশ অনেক উন্নত হবে।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণ হলে শ্রেণিকক্ষের সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে।"
ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বিষয়টি সরকারের নজরে আনতে গত ১৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠান। চিঠিতে তিনি সাধারণ ও অনগ্রসর পরিবারের সন্তানদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ জরুরি উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা কালাম, কামরুল ও নাজমুল হুদা চমন বলেন, "এ মাদ্রাসা থেকে এলাকার বহু মানুষ পড়াশোনা করেছেন। এত পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন জরাজীর্ণ হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করা উচিত।"
তারা আরও বলেন, "এলাকার শিক্ষা বিস্তারে মাদ্রাসাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানে শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নয়, অতীতে বহু মানুষ লেখাপড়া করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সে তুলনায় বাড়েনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই উপকৃত হবেন।"
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, "ভবনটি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বরাবর আবেদন করলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।"
তিনি বলেন, "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ভবনটি যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।"
স্থানীয়রা পুরোনো ভবন বারবার সংস্কার করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নতুন ভবন নির্মাণ করলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান উভয়ই উন্নত হবে বলে তারা আশাবাদী।