ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে আসন্ন বিধান পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উদ্বেগ। দলীয় কোন্দল এবং জোটসঙ্গীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষ দূর করতে বিশেষ তৎপরতা চালিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল নির্ধারণ করতে তিনি লক্ষ্ণৌ সফর করেন। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে শাহ বলেন, “মান-অভিমান, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভুলে যান, যা কিছু অপ্রাপ্তি, অসন্তোষ গোমতীর জলে বিসর্জন দিন।”

গত শুক্রবার রাজ্যের সব জেলার প্রায় আড়াই হাজার দলীয় নেতার এক সম্মেলনে অংশ নিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘সবার সব আশা পূরণ হয় না। অনেকেই অনেক কিছু পান না। এতে মনে ক্ষোভ বা হতাশা জন্মাতেই পারে। আপনাদের মনেও এমন কিছু থাকতে পারে। কিন্তু দলের স্বার্থে এখান থেকে বেরোনোর পর তা গোমতীর জলে বিসর্জন দিন। এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার সময়।’

শাহ আরও উল্লেখ করেন যে, কোনো একক নেতা একা সবাইকে জেতানোর ক্ষমতা রাখেন না; বরং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত করেন।

সম্প্রতি বিধান পরিষদের নির্বাচনে বিজেপি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন বারানসির দুটি আসনেই হেরেছে বিজেপি। এই দুটি আসনই জয় করেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)। বারানসি ছাড়াও এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও আগ্রার আরও তিনটি আসনে জয়লাভ করেছে এসপি।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসপির এই মোট ৫টি আসনে জয় বিজেপির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই নির্বাচনে ভোটার ছিলেন শুধুমাত্র শিক্ষক এবং স্নাতকেরা। অর্থাৎ, শিক্ষিত ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপিকে ত্যাগ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজেপির এই দুশ্চিন্তার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। দেশজুড়ে ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছে, তার অগ্রভাগে রয়েছে শিক্ষিত যুবসমাজ। এর পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশে এনডিএ-র শরিক দলগুলোর মধ্যেও দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ, যা বিজেপির অভ্যন্তরেও বিদ্যমান।

সম্প্রতি রাজ্যের ১১টি রাজ্যসভা আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ৮টি আসন বিজেপির দখলে ছিল। তবে এই আসনগুলোতে বিজেপি পুরনো প্রার্থীদের বদলে নতুন মুখ মনোনয়ন দিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বিধান পরিষদের নির্বাচনে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতেই অমিত শাহকে সক্রিয় হতে হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরতে হলে ব্যক্তিগত মান-অভিমান ও অসন্তোষ গোমতী নদীর জলে বিসর্জন দিতে হবে।

দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী চেতনা জাগ্রত করতে শাহ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন। ওই বৈঠকে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, এবার ক্ষমতায় এসে তাঁরা রাজ্যে ইউসিসি চালু করবেন।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রথম ইউসিসি চালু হয়েছে বিজেপিশাসিত উত্তরাখণ্ডে। এরপর একে একে গুজরাট, আসাম ও মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় এই বিল পাস করা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে এটি চালুর প্রস্তুতি চলছে।

২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসলেও বিজেপি তখন এই পথে হাঁটেনি। এবার নির্বাচনের আগে শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, আগামী বছর রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি দেশের এনডিএ-শাসিত ২১টি রাজ্যেই ইউসিসি চালু করবে এবং ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

প্রধান প্রতিপক্ষ সমাজবাদী পার্টিকে আক্রমণ করতেও ছাড়েননি অমিত শাহ। এসপি নেতা অখিলেশ যাদবের নাম করে তিনি বলেন, “৩০ বছরেও আপনারা উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। জনগণ আপনাদের তৃতীয় প্রজন্মদেরও ক্ষমা করবে না।”

পাল্টা জবাবে অখিলেশ যাদব প্রশ্ন তোলেন, ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি কেন রাজ্যে ইউসিসি চালু করতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন স্যার। স্রেফ বক্তৃতা করে ভোটে জেতা যায় না। বিধান পরিষদের ভোট সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে।’

উত্তরপ্রদেশে বিজেপির প্রধান শরিক দল তিনটি— নিষাদ পার্টি, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় লোকদল। নিষাদ পার্টি ও সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি শুরু থেকেই বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। নিষাদ পার্টি ১১টি এবং সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই দলেই নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।

নিষাদ পার্টির নেতা সঞ্জয় নিষাদ সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবেশে এনডিএ-র প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতির বদল না ঘটলে তাঁরা ভিন্ন রাজনৈতিক পথ বেছে নেবেন। অন্যদিকে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওমপ্রকাশ রাজভরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে এবং দলত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। দলের অনেক সদস্য অখিলেশের দিকে ঝুঁকছেন, যা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

অন্যদিকে, জয়ন্ত চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় লোকদল ২০২২ সালের নির্বাচনে অখিলেশের সঙ্গে জোট বেঁধে ৮টি আসন জিতেছিল। পরবর্তীতে জোট ত্যাগ করে আরএলডি এনডিএ-তে যোগ দেয় এবং জয়ন্ত চৌধুরী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। মূলত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাট সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দলের প্রভাব বেশি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, তা এখনও অস্পষ্ট।

অমিত শাহ এই সব রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পর্কে অবগত। তাঁর বর্তমান প্রধান লক্ষ্য হলো দলীয় নেতাদের ক্ষোভ প্রশমন করা এবং বিধান পরিষদের নির্বাচনে খারাপ ফলের কারণগুলো নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করা। এই উদ্দেশ্যেই তাঁর উত্তরপ্রদেশ সফর।