বলিউডের প্রথিতযশা চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক সঞ্জয় গুপ্ত আর নেই। গতকাল শুক্রবার রাতে নিজ বাসভবনে আকস্মিকভাবে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। এই আঘাতের পর তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৫৭ বছর। হিন্দি চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘কাঁটে’, ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’, ‘কাবিল’ এবং ‘মুম্বাই সাগা’র মতো আলোচিত সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন।

সঞ্জয় গুপ্তের এই অকাল প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা অশোক পণ্ডিত। সংবাদমাধ্যম আউটলুককে তিনি জানান, শুক্রবার রাতে নিজের বাসভবনে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান সঞ্জয়। এরপর তাঁর মৃত্যু হয়। তবে এই দুর্ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানা যায়নি। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

নির্মাতার এই আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কামাল আর খান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর শোকবার্তা শেয়ার করেছেন।

‘কাঁটে’ সিনেমার মাধ্যমে নতুন পরিচিতি
সঞ্জয় গুপ্তের পরিচালনায় অভিষেকের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে ‘আতিশ: ফিল দ্য ফায়ার’ সিনেমার মাধ্যমে। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সঞ্জয় দত্ত ও আদিত্য পাঞ্চোলি। পেশার শুরু থেকেই অ্যাকশন, অপরাধজগত এবং প্রতিশোধের গল্পের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০০২ সালে, যখন তিনি ‘কাঁটে’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন।

অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জয় দত্ত, সুনীল শেঠি, মহেশ মাঞ্জরেকর, লাকি আলী ও কুমার গৌরব অভিনীত এই সিনেমাটি ছিল ছয় ব্যক্তির ব্যাংক ডাকাতি এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের গল্প। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে মাত্র ৩৩ দিনের মধ্যে সিনেমাটির শুটিং শেষ করেছিলেন তিনি। ছবিটির বিশেষ দৃশ্যায়ন, রঙের শৈল্পিক ব্যবহার, আবহসংগীত, সংলাপ এবং একাধিক তারকার সমন্বয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। মুক্তির পর ধীরে ধীরে ছবিটি একটি ‘কাল্ট’ সিনেমার মর্যাদা লাভ করে।

তবে ‘কাঁটে’ সিনেমাটি নিয়ে বিতর্কও কম ছিল না। কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘রিজার্ভয়ার ডগস’ সিনেমার সঙ্গে এর গল্প ও দৃশ্যের মিল নিয়ে দীর্ঘকাল আলোচনা চলেছিল। তবে সঞ্জয় গুপ্ত একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে, তিনি পুরো ‘রিজার্ভয়ার ডগস’ কখনো দেখেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কাঁটে’র গল্পের প্রাথমিক ভাবনা এসেছিল ভারতের একটি আলোচিত গয়নার দোকানে ডাকাতির ঘটনা থেকে। শুরুতে সিনেমাটির নামও ছিল ‘দাগড়ি চাল’। পরবর্তীতে গল্পের পটভূমি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

২০২২ সালে ‘কাঁটে’র ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় জানিয়েছিলেন, সিনেমাটি নির্মাণের সময় তিনি পেশাগতভাবে কঠিন সময় পার করছিলেন। কয়েক বছর নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হতে পারেননি। কয়েকটি প্রকল্প আটকে ছিল, কয়েকটি সিনেমা বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতেই ‘কাঁটে’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন তিনি।

মুম্বাইয়ের অপরাধজগত ও তাঁর সিনেমা
সঞ্জয় গুপ্তের সিনেমার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড, গ্যাংস্টারদের সংঘাত, অপরাধ এবং প্রতিশোধের কাহিনী। এই ধরনের গল্পগুলোকে তিনি উপস্থাপন করতেন স্টাইলিশ দৃশ্যায়ন, দ্রুতগতির সম্পাদনা, তীব্র সংলাপ এবং অ্যাকশনের মাধ্যমে। তাঁর সিনেমায় রঙের বিশেষ ব্যবহারও ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়।

২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’ সিনেমার প্রযোজক ছিলেন সঞ্জয় গুপ্ত, যদিও ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন অপূর্ব লাখিয়া। বিবেক ওবেরয়, সঞ্জয় দত্ত, অমিতাভ বচ্চন ও সুনীল শেঠি অভিনীত এই সিনেমাটি মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি আলোচিত সংঘর্ষের ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল। এই ছবির সাফল্যের পর ২০১৩ সালে একই অপরাধজগতের গল্প নিয়ে ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’ পরিচালনা করেন সঞ্জয়। এতে অভিনয় করেন জন আব্রাহাম, অনিল কাপুর ও তুষার কাপুর।

এ ছাড়া ‘মুসাফির’, ‘জিন্দা’, ‘দশ কাহানিয়া’, ‘জাজবা’ ও ‘মুম্বাই সাগা’ তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমা। ২০১৭ সালে হৃতিক রোশন অভিনীত ‘কাবিল’ পরিচালনা করে তিনি পুনরায় আলোচনায় আসেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক দম্পতির জীবন ও প্রতিশোধের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি তাঁর পরিচিত অপরাধ ও অ্যাকশনধর্মী সিনেমার গণ্ডির বাইরে নতুন ধরনের গল্প বলার একটি প্রয়াস ছিল।

প্রযোজক হিসেবে অবদান
পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও বলিউডে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন সঞ্জয়। ২০০১ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান ‘হোয়াইট ফেদার ফিল্মস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ‘প্ল্যান’, ‘উডস্টক ভিলা’, ‘অ্যাসিড ফ্যাক্টরি’, ‘পঙ্খ’ ও ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান বাটারফ্লাই’র মতো সিনেমা নির্মাণ ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি ভিন্নধর্মী গল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ‘পঙ্খ’-এর মতো সিনেমায় প্রচলিত বলিউডি বিনোদনের বাইরে গিয়ে চরিত্র ও গল্পকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

মৃত্যুর আগেও আলোচনায় ছিলেন
মৃত্যুর আগের বছরগুলোতেও চলচ্চিত্র নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করে আলোচনায় ছিলেন সঞ্জয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া প্রতিবেদনে উঠে আসে, অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে ‘কাঁটে’ নির্মাণের সময়কার নানা অভিজ্ঞতা এবং সিনেমার সংলাপ নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণা। একই মাসে শাহরুখ খানকে নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকির প্রসঙ্গেও তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হয়।