বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার মুখেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে চীনের যে অকৃত্রিম সমর্থন, তা দেখে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা প্রায়ই স্তম্ভিত হয়ে যান। তবে বেইজিং শুরু থেকেই অত্যন্ত ধারাবাহিক ছিল যে, তাদের নিজস্ব স্বার্থগুলো ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে উত্তর শান রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক অভূতপূর্ব পরাজয়ের পর নেপিডো সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ের তথাকথিত ‘তিনটি মূল নীতি’র কথা উল্লেখ করেছিলেন।

সেই নীতি অনুযায়ী, মিয়ানমারকে কোনোভাবেই গৃহযুদ্ধে তলিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না, আসিয়ান জোট থেকে দূরে সরে যেতে দেওয়া যাবে না এবং কোনো বাহ্যিক শক্তি, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো এখানে অনুপ্রবেশ বা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

সহজ কথায়, চীনের মূল অবস্থান ছিল আসিয়ান জোটের কাঠামোর ভেতরে থেকে মিয়ানমার সংকটের সমাধান করা। এর পাশাপাশি বেইজিং এই সতর্কবার্তাও দিয়েছিল যে, গৃহযুদ্ধের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাওয়া, রাষ্ট্রের পতন ঘটা কিংবা অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ সরাসরি চীনের স্বার্থের পরিপন্থী হবে এবং এতে আঘাত হানবে।

পেছনের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ফলে জান্তা সরকারের পতনের ঠিক পরের বছরই চীন–সমর্থিত বার্মা কমিউনিস্ট পার্টির বিলুপ্তি ঘটে। এর পরপরই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে। তখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে সামরিক বাহিনী চীনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়।

সেই সময়ে বেইজিং সিদ্ধান্ত নেয় যে, কেবল সামরিক বাহিনীই মিয়ানমারকে একসুতায় বেঁধে রাখতে সক্ষম। সব ধরনের নৃশংসতা সত্ত্বেও বেইজিং একেই বাস্তবসম্মত সমাধান বলে মনে করত।

২০০৩-০৪ সালে তৎকালীন চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও মালাক্কা প্রণালি ঘিরে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করেন এবং এর ফলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা তুলে ধরেন। সেই কৌশলগত বাধা এড়াতে বেইজিং মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন তৈরির প্রস্তাব দেয়।

তৎকালীন জান্তা সরকার সেই প্রস্তাব সানন্দে মেনে নেয়। এর ফলে চীন এখন মালাক্কা প্রণালিকে এড়িয়ে বছরে প্রায় ২২ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে পারছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চীন আজও মিয়ানমার সেনাবাহিনীকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে। সীমান্ত এলাকার জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তারা দ্বিতীয় সারির শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৪ সালে উত্তর শানের রাজধানী ল্যাশিও হারানোর পর যখন সামরিক জান্তা পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, তখন বেইজিং যে তাদের পতন হতে দেবে না এবং পুনরায় টিকিয়ে তুলবে—তা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল।

অবশ্য মিয়ানমার নিয়ে চীনের এই নির্দিষ্ট নীতি কিছু সাময়িক সফলতাও এনে দিয়েছে। এর ফলেই জান্তা সরকার একটি প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করে একটি তথাকথিত বেসামরিক সরকারের রূপ নিতে সক্ষম হয়েছে এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোও মিয়ানমারের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ শুরু করেছে।

এই শাসনের সঙ্গে এসব দেশের যোগাযোগ কেবল বাণিজ্য, অভিবাসন, মাদকের কালোবাজারি বা অনলাইন স্ক্যামের উদ্বেগের কারণে নয়, বরং এর পেছনে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় ভূমিকা রেখেছে। এটি সম্পূর্ণ একটি বাস্তবমুখী ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি, যেখানে নৈতিক আদর্শের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অনেক বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তা সত্ত্বেও মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। যুদ্ধ থামেনি, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতাও ফেরেনি। মিন অং হ্লাইংয়ের আয়োজিত নির্বাচন কেবল বিমান হামলা, সামরিক অভিযান, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধকেই আরও ত্বরান্বিত করেছে।

থেইন সেইন সরকারের মতো বর্তমান এই পরিবর্তিত জান্তা প্রশাসন কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার আনেনি। তারা সার্বিক শান্তির পথ প্রত্যাখ্যান করে উল্টো প্রতিরোধ গড়ে তোলা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরির চক্রান্ত করছে।

বাস্তবতা হলো, জান্তা সরকার এখনো কেবল সামরিক পথেই সমস্যার সমাধান খুঁজছে এবং চীনের সমর্থনে হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। চীন হস্তক্ষেপ করার পর উত্তর শান রাজ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটলেও দেশের বাকি অংশে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

জান্তা সরকার এক লাখ তরুণকে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করেছে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। ফলে দেশে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন মেধা পাচার, যা মিয়ানমারকে মানবসম্পদের দিক থেকে আগের চেয়ে বহুগুণ দরিদ্র করে তুলেছে।

মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। যুদ্ধ থামেনি, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতাও ফেরেনি। মিন অং হ্লাইংয়ের আয়োজিত নির্বাচন কেবল বিমান হামলা, সামরিক অভিযান, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধকেই আরও ত্বরান্বিত করেছে।

বিগত দুই বছরে চীনের প্রবল সহায়তা সত্ত্বেও জান্তা সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া ১০০টির বেশি শহরের মধ্যে মাত্র ২১টি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ৮০টির বেশি শহর পুনরুদ্ধারের গতিও নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। দেশের গ্রামীণ এলাকা ও প্রধান পথগুলো এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

সোজা কথায়, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা আনার যে স্বপ্ন চীন দেখেছিল, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক দূরে সরে গেছে। স্থিতিশীলতার জন্য সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা রাখতে গিয়ে বেইজিং নিজেকে এক মহাব্যর্থতার জালে বন্দী করে ফেলেছে। পরিস্থিতি বদলানোর জন্য কি এখন বেইজিংয়ের অনেক দেরি হয়ে গেল?

—থেট এইচটার মং একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(দ্য ইরাবতী থেকে সংক্ষেপে অনূদিত)