মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে ওই নারী আদালতে মামলা করেছিলেন, যার প্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ গ্রহণ করল।

গত সপ্তাহে রয়টার্স প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বসানো সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পূর্ববর্তী নীতি থেকে সরে এসেছে। ২০২১ সালে নির্বাচিত নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করা জেনারেলদের আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখাই ছিল সেই নীতির মূল লক্ষ্য। রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনের পরপরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত সামনে এল।

মিয়ানমারের নাগরিক থেইন্ট উইন থেটকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড ন্যাশনালস অ্যান্ড ব্লকড পারসনস লিস্ট’ (এসডিএন তালিকা) থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানান, এই সিদ্ধান্ত “প্রশাসনের এই মূল্যায়নেরই প্রতিফলন যে বার্মা-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে এই তালিকাভুক্তি আর কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।”

ওই মুখপাত্র আরও উল্লেখ করেন, “বার্মার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে প্রশাসন নানা উপায় কাজে লাগাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতারণাকেন্দ্র (স্ক্যাম সেন্টার) দমন, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বার্মার অভ্যন্তরীণ পরিবেশের উন্নয়ন এবং চলমান সহিংসতা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা।” উল্লেখ্য, মুখপাত্র মিয়ানমারের পূর্ব নাম ‘বার্মা’ ব্যবহার করেছেন।

২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে জান্তাকে সহায়তার অভিযোগে বেশ কিছু কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয় বাইডেন প্রশাসন। ওই অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে আনুমানিক ১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ৩৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় শ্বে বায়াইন ফিউ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, এর প্রতিষ্ঠাতা থেইন উইন জাও এবং তাঁর পরিবারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছিল। সে সময় মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানটি সামরিক বাহিনীর পক্ষে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণের কাজ করত। এছাড়া ওই পরিবার জান্তা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অন্তত ২০টি কোম্পানির মালিক বলে জানানো হয়।

থেইন উইন জাওয়ের মেয়ে থেইন্ট উইন থেট এসডিএন তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত তাঁর সেই মামলাটি খারিজ করে দেন। সাধারণত এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা যেকোনো সম্পদ অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং মার্কিন নাগরিকদের সাথে তাঁদের লেনদেন নিষিদ্ধ থাকে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের আরও কয়েকজন নাগরিক এবং একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যাদের সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

চলতি বছরের জুলাইয়ে থেইন্ট উইন থেট নতুন করে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন যে, তাঁর বাবার ব্যবসায় তাঁর কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই। তিনি আরও দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলেন।

থেইন্ট উইন থেটের অভিযোগে বলা হয়, “বাদীর মার্কিন ক্রেডিট কার্ডগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিদেশি ব্যাংক হিসাব সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে, কিংবা হিসাব খুলতে দেওয়া হয়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ করতে পারেননি।” অভিযোগে তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে ব্যাংককে অবস্থান করছেন। গত বছর তাঁর মাকে এই নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির দাবি, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যখন সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বৃদ্ধি করছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নিল। সংগঠনটি বলেছে, “জান্তার সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মার্কিন সরকার তালিকা থেকে বাদ দিয়েই চলেছে। এটা নিন্দনীয়।”

থেইন্ট উইন থেটের আইনজীবী এরিক ফেরারি একজন ওয়াশিংটনভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা-বিশেষজ্ঞ। তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর গত শুক্রবার তিনি ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মার্কিন জেলা আদালতে একটি নোটিশ প্রদান করেন, যেখানে তিনি স্বেচ্ছায় মামলাটি প্রত্যাহারের কথা জানান। তবে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ফেরারি।