ধানখেতে ক্ষতিকর পোকা দমনের জন্য পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি হলো আলোক ফাঁদ। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের আগ্রহ থাকলেও কীটনাশকের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতার কারণে এখনো পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভা ব্লকের দড়িচন্ডিব এলাকায় একটি আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়। ধানখেতে পোকা ধরার জন্য সেখানে আলো জ্বালানো হলে আলোর আকর্ষণে উড়ে এসে বিভিন্ন ধরনের পোকা ধরা পড়ে। সেই ফাঁদ ঘিরে দাঁড়িয়ে উৎসুক হয়ে পোকাগুলো দেখছিলেন স্থানীয় কৃষক মুরাদ মিয়া। তবে কৃষি কর্মকর্তারা যখন জানান যে, বর্তমানে পোকার উপস্থিতি থাকলেও কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তখন তিনি আশ্বস্ত হতে পারেননি। মুরাদ মিয়ার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—পোকা মারার বিষ না দিলে ধান রক্ষা হবে কীভাবে?
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দড়িচন্ডিবের ওই এলাকায় বসানো আলোক ফাঁদটি দেখতে মুরাদ মিয়া ছাড়াও আরও অন্তত ২০ জন কৃষক জড়ো হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন নারী কৃষকও ছিলেন। মুরাদ মিয়া এবার ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন।
মূলত আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় এমন ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত ও ধরে ফেলার জন্য এই আলোক ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। ধানখেতের মাজরা পোকা, পামরি পোকা এবং পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দমনে এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি।
ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আলোক ফাঁদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ আছে, তাঁরা ফাঁদ দেখতে আসেন, কর্মকর্তাদের কথাও শোনেন। কিন্তু ধানখেতে পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শে অনেকেরই ভরসা হয় না। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো বিষ না দিলে পোকা ধান নষ্ট করে ফেলতে পারে। ফলে পোকা শনাক্ত ও দমনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে আলোক ফাঁদ ব্যবহারের উদ্যোগ থাকলেও কৃষকদের আস্থা অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।”
কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভৈরবে আমন ধানের পোকা পর্যবেক্ষণে ২২টি ব্লকে মোট ২২০টি আলোক ফাঁদ স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দড়িচন্ডিব এলাকায় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালানো হয়। সেখানে ২ টি মাজরা পোকা, ৩ টি পাতা মোড়ানো পোকা, ৩ টি সবুজ পাতা ফড়িং, ২৫ টি খাটো ঘাসফড়িং ও ৩ টি অপরিচিত পোকা শনাক্ত করা হয়। ফাঁদে কিছু উপকারী পোকাও পাওয়া গেলেও ধানের অন্যতম প্রধান শত্রু বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি।
ফাঁদে পাওয়া পোকার ধরন ও সংখ্যা বিশ্লেষণ করে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের আপাতত কীটনাশক ব্যবহার না করে ‘পার্চিং’ করার পরামর্শ দেন। পার্চিং পদ্ধতিতে ধানখেতে বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে পোকাখেকো পাখিরা এসে ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে।
তবে এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চেয়ে বিষ প্রয়োগের প্রতিই বেশি ঝুঁকে আছেন অনেক কৃষক। দড়িচন্ডিবের কৃষক জহির মিয়া, যিনি ৩৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন, তাঁর সংশয় কাটেনি। জহির মিয়া বলেন, “স্যারদের কথা ঠিক আছে। তবে কিছু বিষ না দিলে কেমনে হয়? আবার যদি সব ধান খাইয়া ফেলে?”
অন্যদিকে, স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলামের স্ত্রী সাহানা বেগম আট শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেছেন। আলোক ফাঁদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “খেতে কয়ডা পোকা আছে, লাইট জ্বালাইয়া বুঝবে কেমনে?”
তবে সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। একই এলাকার কৃষক নবী হোসেন এবার ৭০ শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেছেন। সাধারণত তাঁর প্রায় আড়াই হাজার টাকার কীটনাশক লাগত, কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে এবার মাত্র ৮০০ টাকার কীটনাশক ব্যবহার করেছেন তিনি। নবী হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত তাঁর ধানের অবস্থা বেশ ভালো রয়েছে।
ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ২ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। এসব জমিতে পোকা পর্যবেক্ষণের জন্য ২২টি ব্লকে ২২০টি আলোক ফাঁদ স্থাপনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১৭৫টি ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ফাঁদের পর্যবেক্ষণ এলাকা ২০ হেক্টর জমি। এই ফাঁদগুলো স্থায়ীভাবে রাখা হয় না; প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে বসানো হয় এবং একই স্থানে দ্বিতীয়বার বসানো হয় না। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে এটি স্থাপন করতে পারেন। তবে এই পদ্ধতির সুফল কৃষকদের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান হয় না বলে তাঁদের মনে ভয় ও সংশয় কাজ করে।
প্রতিটি ফাঁদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন এবং এসব তথ্য নথিভুক্ত করে জেলা কার্যালয়ে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর স্থাপন করা ফাঁদগুলোতে কোনো বাদামি গাছফড়িং পাওয়া যায়নি।
শিমুলকান্দি ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার জানান, ওই ব্লকে ১ হাজার ১৬৫ জন কৃষক ১১০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করেছেন। অনেক কৃষক আলোক ফাঁদ দেখতে এলেও পরামর্শ মেনে চলার ক্ষেত্রে তাঁদের আপত্তি থাকে। ঝগড়ারচর ব্লকের উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, “ফাঁদের সুফল কৃষকের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান নয়। ফলে এর কার্যকারিতা নিয়ে তাঁদের মনে ভয় ও সংশয় থাকে।”
আলোক ফাঁদ কর্মসূচির সফলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আকলিমা বেগম বলেন, “পোকা দমনে আলোক ফাঁদ সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি। তবে কৃষকের প্রধান ভরসা এখনো এটি হয়ে ওঠেনি। অনেক কৃষক জানেন না, তাঁদের জমিতে আদৌ কীটনাশক প্রয়োজন কি না কিংবা কতটুকু প্রয়োজন। এ বিষয়ে কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে বোঝাপড়ার কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে।”
কৃষকদের এই সংশয় দূর করার উপায় সম্পর্কে আকলিমা বেগম আরও বলেন, “কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। আলোক ফাঁদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কৃষকেরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু কোথাও একটা অবিশ্বাস রয়ে গেছে। এই দূরত্ব কমাতে কৃষি বিভাগের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।”