কয়েক বছর আগেও কিশোরগঞ্জের ভৈরবের বইয়ের দোকানগুলোতে গল্প ও উপন্যাসের বই কিনতে যেতেন সরকারি হাজী আসমত কলেজের শিক্ষার্থী আফিকুল ইসলাম। তখন সব বই না মিললেও বেশ কিছু পছন্দের বই পাওয়া যেত। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। লাইব্রেরিগুলোতে সাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।

আফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “একসময় বইয়ের দোকানে গল্প, উপন্যাস ও অন্যান্য সাহিত্যবিষয়ক বইয়ের আলাদা তাক থাকত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্য সহায়ক ও গাইড বই। সাহিত্যের কিছু বই থাকলেও সেগুলোর ঠাঁই হচ্ছে পেছনের ঘরে কিংবা আড়ালের তাকে।”

গত শুক্রবার ভৈরবের একাধিক বাণিজ্যিক লাইব্রেরি পরিদর্শনে গিয়ে আফিকুল ইসলামের এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। লাইব্রেরি ব্যবসায়ীদের দাবি, গত এক দশকে পাঠ্য সহায়ক বইয়ের ব্যবসা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এসব বইয়ের চাহিদা নির্দিষ্ট হওয়ায় বিক্রি করা তুলনামূলক সহজ। অন্যদিকে, সাহিত্যের বইয়ের পরিধি অনেক বড়। সব ধরনের পাঠকের রুচি ও চাহিদা মেটাতে হলে প্রচুর বই সংগ্রহ করে রাখতে হয়, যার ফলে পুঁজি ও জায়গার প্রয়োজন বেশি হয় এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ভৈরবের পরিচিত বাণিজ্যিক লাইব্রেরি ‘বর্ণমালা’ একসময় সাহিত্যের বইয়ের জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে শুক্রবার সেখানে দেখা যায়, দোকানের প্রায় সব জায়গাতেই সাজানো রয়েছে পাঠ্য সহায়ক বই। সাহিত্যের বইগুলো ঠাঁই পেয়েছে এক কোণে অল্প কিছু হিসেবে, আর গল্প-উপন্যাসের বেশ কিছু বই স্তূপ করে রাখা হয়েছে পেছনের একটি ঘরে।

লাইব্রেরির মালিক জহিরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীরা এখন একাধিক পাঠ্য সহায়ক বই কেনে। এসব বইয়ের চাহিদা নির্দিষ্ট। ক্রেতারা বইয়ের নাম বললেই দেওয়া যায়, দামও নির্ধারিত। ফলে অল্প সময়েই লেনদেন শেষ হয়।” তিনি মনে করেন, সাহিত্যের বইয়ের ক্রেতা এবং সংগ্রহ—উভয়ই কমেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, কোন পাঠক কোন বই খুঁজবেন তা আগে থেকে বোঝা কঠিন। সব ধরনের বই সংগ্রহে রাখলে খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ে। তিনি জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি বই বিক্রি করা যেত, এখন শুক্রবার ছাড়া প্রায়ই বিক্রিশূন্য দিন পার করতে হয়।

পৌর শহরের কলেজ রোডে অবস্থিত ৭৬ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান গোলাপ বুক স্টলেও সাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। বইগুলো রাখা হয়েছে পেছনের তাকে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মুনিসুল ইসলাম জানান, পাঁচ-সাত বছর আগেও দিনে গড়ে ৩০টি সাহিত্যবিষয়ক বই বিক্রি হতো, যা এখন নেমে এসে মাত্র কয়েকটি বইয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুনিসুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “আগে স্কুল-কলেজে বা ক্লাব সংগঠনের অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে বই থাকত। জন্মদিনে বই উপহার দেওয়ার বদলে ফুল বা কেক দেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। সন্তান সঙ্গে নিয়ে এসে এখন আগের মতো বাবা-মায়েরা বই কেনেন না। অনেকে পিডিএফ ও গুগলে বই খুঁজে পড়েন।” সাহিত্যের বইয়ের সামনের সারি থেকে পেছনে চলে যাওয়া এবং সংগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে তিনি এই কারণগুলোকেই দায়ী করেন।

ভৈরবের অন্যতম প্রাচীন লাইব্রেরি হলো ৫২ বছর পুরোনো মেঘনা লাইব্রেরি। একসময় ভৈরবসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে সাহিত্যের বইয়ের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ সাহিত্যের বইয়ের প্রতি অনেক কমেছে। লাইব্রেরির পরিচালক অর্ণব জামান বলেন, শুধু বইয়ের সংখ্যাই নয়, বরং ভালো বই রাখার প্রবণতাও কমেছে। ভালো পাঠকের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় পাঠক তৈরির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

ভৈরব বন্ধুসভা মাসে অন্তত দুবার মুদ্রিত বই নিয়ে পাঠচক্রের আয়োজন করে। সংগঠনটির পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক মহিমা মেধা জানান, পাঠচক্রের জন্য প্রয়োজনীয় বই স্থানীয় লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সবসময় অনিশ্চয়তা থাকে। এই কারণে গত কয়েক বছর ধরে অনলাইনে বই অর্ডার করতে হচ্ছে, যার ফলে সময় ও খরচ—উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে।

কাকলি খেলাঘর ভৈরব শাখার সভাপতি মফিজুল ইসলাম বলেন, গাইড বইয়ের চাপে সাহিত্যের বই আড়ালে চলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সক্রিয় পাঠাগারের অভাব। ফলে অবসর সময়ে গল্প-উপন্যাস পড়তে চাওয়া মানুষের বই সংগ্রহের সুযোগ কমেছে।

ভৈরব বইমেলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানিক চৌধুরী জানান, গত ২৭ বছর ধরে তাঁরা ভৈরবে একুশে বইমেলার আয়োজন করছেন। আগে মেলার স্টল পরিচালকেরা প্রয়োজনীয় বইয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাহিদামতো বই না পাওয়ায় মেলার জন্য অধিকাংশ বই ঢাকা থেকে আনতে হচ্ছে।

ভৈরব পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম কলেজ রোডের ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরির মালিক। ভৈরবে সমিতির সদস্যভুক্ত লাইব্রেরির সংখ্যা ২৫টি। তাঁর লাইব্রেরির আকার ১২ ফুট বাই ৭ ফুট এবং বার্ষিক ভাড়া ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর লাইব্রেরির একটি তাকে সাহিত্যের বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, মাসিক ভাড়ার পাশাপাশি প্রতিটি দোকানের বিপরীতে অগ্রিম কয়েক লাখ টাকা জমা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কম চাহিদার বইয়ের জন্য বড় জায়গা রাখা কঠিন।

সাহিত্যের বইয়ের জায়গা ফিরবে কি না—এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলামের উত্তর, “এক দশক আগেও প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছি। এখন সপ্তাহে কয়েকটির বেশি বিক্রি হয় না। নির্দিষ্ট পাঠকেরাও বই কিনতে আসা কমিয়ে দিয়েছে।” তাঁর মতে, লাইব্রেরিতে সাহিত্যের তাক কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা নির্ভর করছে পাঠকের চাহিদা এবং বই পড়ার পরিবেশ তৈরির ওপর।

পুরস্কার হিসেবে বই দেওয়ার ব্যাপারে সরকারি ঘোষণা থাকার কথা জানিয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, “এ কথা সত্য যে বই আদান–প্রদানের সংস্কৃতি কমে গেছে।” পাঠক যেন বইয়ের দোকানে গিয়ে সাহিত্যের বই না পেয়ে ফিরে না আসেন, সে বিষয়ে পুস্তক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে করণীয় নির্ধারণ করার কথা জানান তিনি।