বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় উঠে এসেছে এক আশাব্যঞ্জক চিত্র। জানা গেছে যে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিশেষ করে অটোমোবাইল, বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান ও জাপানি উদ্যোক্তারা। এই বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানের সঙ্গে এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) এর বাস্তবায়ন। এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তার মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং, সেমিকন্ডাক্টর ও আইসিটি, ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য এবং জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকাকে কেন্দ্র করে ‘বিগ বি’ উদ্যোগ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) নিয়ে কথা হয়েছে, যার আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক-নৌ-রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত। মূলত বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক বিভিন্ন খাতে উভয় দেশের পারস্পরিক সমঝোতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করার বিষয়গুলোই এই সফরের মূল উপজীব্য।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, ম্যানুফ্যাকচারিং, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে এবং ইপিএ-র সুবিধা নিয়ে এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৪০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যাদের অনেকেই তাদের ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে আগ্রহী। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, নির্মাণ এবং তৈরি পোশাক খাতে জাপানের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আগে থেকেই বিদ্যমান।
তবে বর্তমান বিনিয়োগকে আরও সম্প্রসারিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের খাতভিত্তিক সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু বাধা যেমন—প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং কাঠামোগত সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে জাপানি বিনিয়োগের পূর্ণ সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না। এই ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত ও সহজে ব্যবসার অনুমোদন প্রদান, দক্ষ বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা এবং সুষ্ঠু অবকাঠামো ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাপান কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের একজন পুরোনো বন্ধু। বর্তমানে এই সম্পর্ককে নতুন করে জোরদার করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার সুফল পেতে হলে দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। মূলত বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো এবং সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমেই জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির অংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বাণিজ্য ও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রথাগত বাজারের বাইরে এবং প্রথাগত ও অপ্রথাগত উভয় ধরনের পণ্যের জন্য জাপান একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উদ্ভাবন, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর বিপণন কৌশল তৈরিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সহযোগিতার তৃতীয় ক্ষেত্র হিসেবে ইপিএ-র আওতায় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত দ্রব্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হিমায়িত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের আন্তর্জাতিক গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ছাড়পত্র তৈরির কারিগরি সহায়তা জাপান প্রদান করতে পারে।
পারস্পরিক সহযোগিতার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ‘বিগ-বি’, যে বিষয়ে জাপানের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ও ত্বরিত ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি বিগ বি-কে কেন্দ্র করে গৃহীত উদ্যোগগুলোতে সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক অনন্য ক্ষেত্র হতে পারে জাপানের শ্রমবাজার। জাপানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বয়স্ক হওয়ায় সেখানে বার্ধক্যজনিত শ্রমিক-সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বয়স্কদের সেবা কার্যক্রম এবং অন্যান্য খাতের জন্য তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। তবে পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন নীতিগত, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবের কারণে এই সুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানবসম্পদকেন্দ্রিক বিনিয়োগের আঙ্গিকে বেশ কিছু বিষয়ে জোর দিতে হবে। যেমন—জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও নির্দিষ্ট কিছু জেলায় (চাহিদা ও আগ্রহের ভিত্তিতে) সুলভে ও সহজে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ভাষা শিক্ষা নয়, আন্তব্যক্তিক সংযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং চাকরি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
জাপানের মতো উন্নত দেশের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত না হলে নিয়োগপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে এক ধরনের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু নিয়োগ ও অভিবাসনকেন্দ্রিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এই ইকোসিস্টেমের আওতায় চাকরি-সংক্রান্ত তথ্যসেবার পাশাপাশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসনের জন্য সরকারি তদারকিতে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের তৎপরতা বন্ধ করে অভিবাসন খরচ কমিয়ে জাপানি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে জাপানের মতো অপেক্ষাকৃত কম সংযোগের শ্রমবাজারে অভিবাসনের ক্ষেত্রে প্রথমেই তাদের শ্রমবাজারের সঠিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অর্থাৎ কোন খাতে শ্রমিকের চাহিদা বেশি, কোন যোগ্যতার জন্য কী ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে এবং কোন দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি—তার আলোকে আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া সাজাতে হবে।
জাপান কূটনৈতিকভাবে আমাদের পুরোনো বন্ধু। বর্তমানে এই সম্পর্ককে নতুন করে জোরদার করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনার সুফল পেতে হলে দেশের ভেতরে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পুরোনো বন্ধুত্বকে পুঁজি করে অর্থনৈতিক সুবিধা কতটুকু নিতে পারবে বাংলাদেশ সেটি নির্ভর করছে ত্বরিত কর্মপরিকল্পনা, বিনিয়োগে দক্ষতা, প্রশাসনিক কর্মতৎপরতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর।
— ড. সায়মা হক বিদিশা
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের নিজস্ব)