একটি নিজস্ব খেলার মাঠ পাওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন সত্যি করলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক অবদানে ৬০ শতাংশ জমি ক্রয় করে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কেউ দিয়েছেন ২০০ টাকা, আবার কেউ দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা—এমনভাবে সবার সহযোগিতায় এই জমি কেনা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাঠের জমিটি বুঝে পেয়ে চরম আনন্দে মেতেছেন গ্রামবাসী।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে জমির মালিকানা বুঝে পাওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনসংখ্যা এবং সাত শতাধিক পরিবারের এই গ্রামে আগে কোনো নির্দিষ্ট খেলার মাঠ ছিল না। ফলে ধান কাটার পর মাঠ ফাঁকা হলে শিশু-কিশোররা সেখানে খেলাধুলা করতে পারত, কিন্তু নতুন করে ফসল আবাদ শুরু হলেই তাদের খেলাধুলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেত। এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেন গ্রামেরই সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ এবং ক্রীড়াসক্ত খোরশেদ আলম। কয়েক মাস আগে তাদের প্রাথমিক আলোচনার পর গ্রামের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সবাই এই উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়। সেই সভায় উপস্থিত সবাই জমি কেনার পক্ষে মত দেন এবং সাধ্যমতো অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
উদ্যোক্তারা জানান, গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছেন; কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ বা ১ হাজার টাকা দিয়েছেন। আবার অনেকে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা করেছেন। এছাড়া ইকবাল মাহমুদ ও খোরশেদ আলমসহ গ্রামের আরও কয়েকজন ব্যক্তি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রদান করে এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
সবার দেওয়া এই সংগৃহীত অর্থ দিয়ে গ্রামের মো. ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে শতাংশ প্রতি ৫২ হাজার টাকা দরে মোট ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। উল্লেখ্য, জমির মালিক নিজেও এক শতাংশ জমি দান করেছেন। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই জমিটি গ্রামবাসীর কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
জমি বুঝিয়ে দেওয়ার দিনটি ছিল উৎসবের মতো। সকাল থেকেই পুরো গ্রামে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছিল। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সব বয়সী মানুষ নতুন মাঠের জমিতে জড়ো হন। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং গ্রামের প্রবীণদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তরুণেরা। দিনব্যাপী নানা আয়োজনে মেতে ওঠেন গ্রামবাসী।
উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানান, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হলেও এর পাশে আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। মোট ১২০ শতাংশ জমি নিয়ে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামে ক্রীড়াচর্চাকে আরও এগিয়ে নিতে চান তারা।
নতুন মাঠ পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিশু-কিশোররাও। তাদের ভাষ্য, আগে ফসলের মৌসুমের কারণে খেলাধুলা ব্যাহত হতো, এখন সারা বছরই নিয়মিত খেলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা দারুণ খুশি।
গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, “একটি খেলার মাঠের জন্য তারা দীর্ঘকাল ধরে চেষ্টা করে আসছিলেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ায় গ্রামের সবাই আনন্দিত।”
বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, “গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি খেলার মাঠ। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া এক বিরাট অর্জন।”
সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের জমি ক্রয়ের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তার মতে, বাবুপুরের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষকেও নিজেদের প্রয়োজনে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।
দেলদুয়ার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ফেরদৌস বলেন, “ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবার এভাবে এগিয়ে আসা সত্যিই অনুকরণীয়। খেলাধুলা শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাবুপুরের এই উদ্যোগ শুধু একটি খেলার মাঠ নয়, বরং গ্রামের মানুষের ঐক্য ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোহরা সুলতানা যূথী বলেন, “গ্রামবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে চাঁদা তুলে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। এ ধরনের মাঠ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতেও বড় ভূমিকা রাখবে।”