রাজধানীর ধলপুরে এসআরবি-র (অধুনালুপ্ত র্যাব) এক অভিযানে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন কারখানা শ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। সংশ্লিষ্ট বাহিনীটি গুলি চালানোর কথা স্বীকার করলেও, প্রাণঘাতী সেই গুলিটি ঠিক কার অস্ত্র থেকে নির্গত হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। (এসআরবির অভিযানের সময় তরুণের মৃত্যু, গুলি করেছে কে, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন, ৩০ অক্টোবর ২০২৬)
অন্যদিকে, বরিশালের হিজলা এলাকায় গুলিতে জেলে আকতার হোসেন হাওলাদারের মৃত্যুর ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে কোনো অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন। (ইলিশ ধরতে গিয়ে ‘নৌ-পুলিশের’ গুলিতে ঝাঁঝরা জেলের বুক, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু, বাংলা ট্রিবিউন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬)
এই দুটি পৃথক ঘটনাতেই মানুষের জীবন চলে গেছে, কিন্তু সেই মৃত্যুর প্রকৃত দায় কার, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে সামনে এল যখন পুলিশপ্রধানের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বহুল বিতর্কিত বক্তব্যের রেশ কাটেনি। সরকার অনুমতি প্রদান করলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে—আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এই মন্তব্যের পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি, অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
এমন এক স্পর্শকাতর প্রেক্ষাপটে গুলিতে দুটি মৃত্যুকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো উদ্বেগের বিষয়টি বোঝা সম্ভব হবে না। আইজিপির বক্তব্যের সঙ্গে ধলপুর ও হিজলার ঘটনার সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আগে এই ঘটনাগুলোকে ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করাও সংগত হবে না। তবে পুলিশপ্রধান যখন প্রকাশ্যে এমন একটি পদ্ধতির কথা বলেন, এবং তার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মানুষের মৃত্যু ঘটে ও দায় নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির ওই বক্তব্যের পর সরকার তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকারের প্রতিক্রিয়ায় এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ক্ষতি কমানোর প্রচেষ্টা স্পষ্ট। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের অবস্থান এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আত্মরক্ষা ও অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আইজিপির বক্তব্যকে সমর্থন করেছে; এমনকি তারা ওই বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ বলে উল্লেখ করেছে। (আইজিপির বক্তব্য ‘সময়োপযোগী আহ্বান’: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম, ২৭ অক্টোবর ২০২৬)
বাহিনীর প্রধানের এমন বক্তব্য যখন পেশাজীবীদের সংগঠন সমর্থন করে, তখন প্রশ্ন জাগে যে তাঁর এই চিন্তাধারার গ্রহণযোগ্যতা বাহিনীর ভেতরে কতটা গভীরে বিস্তৃত। নাগরিকদের মনে তৈরি হওয়া আশঙ্কা দূর করতে তারা বলপ্রয়োগের সীমা এবং জবাবদিহির ওপর জোর দিতে পারত, কিন্তু তার পরিবর্তে আইজিপির বক্তব্যটি কেন ‘সঠিক’, সেই যুক্তিই তারা সামনে এনেছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে প্রথমে অস্বস্তিকর সত্যগুলো স্বীকার করতে হবে। এরপর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার যদি সত্যিই ‘ক্রসফায়ার’, গুম বা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে চায়, তবে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বাহিনীর বাস্তব কর্মকাণ্ড ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক যে বাহিনীর সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা বা বক্তব্য থেকে বোঝার চেষ্টা করেন যে কোন ধরনের আচরণ সমর্থন পাবে এবং কোনটির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। পুলিশপ্রধানের বিতর্কিত বক্তব্যের পর পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থন মাঠপর্যায়ে কী বার্তা দেয়? কঠোরতার নামে সীমা অতিক্রম করলেও কি প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পাওয়া যাবে?
একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কি কোনো বিতর্কিত পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার আগে তার পক্ষে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা? প্রকাশ্যে ‘ক্রসফায়ার’-কে সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা, সমালোচনার পর তার পক্ষে যুক্তি দেওয়া এবং একে আত্মরক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো—এটি হতে পারে ‘ক্রসফায়ার’-এর বিরুদ্ধে জনমত ও আপত্তিকে দুর্বল করার একটি কৌশল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের সময় এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমের ঘটনা বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। …’ (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, ২৯ অক্টোবর ২০২৬)। তিনি এর আগেও একাধিকবার একই ধরনের কথা বলেছেন। তাঁর এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘ডিফেন্ড’ করার চেষ্টা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এবং এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে, হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির চাপে ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে পারে না। তাই হেফাজতে নির্যাতনের মামলা না হওয়ার অর্থ এই নয় যে ঘটনাগুলো ঘটেনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই মৌলিক পার্থক্যটি উপেক্ষা করেছেন।
গুমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। খুলনার মোংলার মিরাজ শেখকে ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই অভিযোগে কোস্টগার্ডের দায় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা এখনই বলা যাবে না। তবে অভিযোগটি অসত্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার সেটিকে হিসাবের বাইরে রাখতে পারে না। একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁর পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে—এমন অবস্থায় ‘গুম ঘটেনি’ বলা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই বাহিনীগুলোকে ‘ডিফেন্ড’ করে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্য তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাধা হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে সেই বক্তব্যকে সঠিক প্রমাণ করাই তখন বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে। তবে সমস্যা শুধু বক্তব্যে নয়, বরং অভিযোগ ও ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করার প্রবণতায়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে প্রথমে অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে। তারপর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার সত্যি সত্যি ‘ক্রসফায়ার’, গুম বা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে চাইলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ও জবাবদিহিতে।
অপরাধ দমনে মানুষ পুলিশের কার্যকারিতা দেখতে চায়। তবে সেই প্রত্যাশাকে ‘ক্রসফায়ার’-এর পক্ষে সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইজিপির বিতর্কিত বক্তব্যের পর দুটি মৃত্যু যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। সরকার ও বাহিনীর নেতৃত্বকে কাজে প্রমাণ করতে হবে যে, কঠোরতা মানে প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয় এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার পুরোনো পথ আর খোলা নেই।
মনজুরুল ইসলাম
মুক্তকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব