গাছপালার ঘন সবুজ আর নির্জন এক পরিবেশ। সেই জঙ্গলের আড়ালেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজের একটি প্রাচীন মসজিদ। স্থাপনাটিতে নেই কোনো নির্মাণ শিলালিপি, নেই প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট কোনো সাল বা তারিখের উল্লেখ। তা সত্ত্বেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি অত্যন্ত পরিচিত ‘গায়েবী মসজিদ’ নামে। এই মসজিদের নাম, নির্মাণকাল এবং প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে নানা রহস্যময় গল্প ও জনশ্রুতি। সেই রহস্যের কৌতূহল আর গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের টানেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানি ইউনিয়নের এই মসজিদে।
মসজিদটির দেয়াল এবং ছাদে প্রাচীন নির্মাণশৈলীর স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। স্থাপনাটির দুই পাশে থাকা জানালা এবং সামনের ছোট প্রবেশদ্বারটি একে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে। তবে ঠিক কত সালে, কাদের তত্ত্বাবধানে এবং কীভাবে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো লিখিত দলিল বা তথ্য পাওয়া যায়নি। কেবল স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত বর্ণনার মাধ্যমেই এর ইতিহাস জানা যায়।
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতানি আমলের সময় কয়েকজন মুসলিম ধর্মপ্রচারক যমুনা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলে আগমন করেন। তারা এখানে খানকাহ ও মসজিদ স্থাপন করে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তাঁদের মাধ্যমেই এই আশপাশের জনপদে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে মসজিদটি ঠিক কত বছরের পুরনো, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না কেউই।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমার দাদা, তার দাদা এভাবে কয়েক পুরুষ ধরে আমরা এখানে আছি। কিন্তু মসজিদটি ঠিক কত দিনের পুরোনো, তা কেউ বলতে পারে না। অনেক পুরোনো বলেই আমরা জানি। এলাকায় এটি গায়েবী মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত।”
মসজিদটিকে ঘিরে আরও কিছু চমকপ্রদ লোককথা প্রচলিত আছে। স্থানীয় রুকন জানান, একসময় এখানে দুটি সাপ বাস করত, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষরা দেখেছিলেন। তিনি বলেন, “একসময় এখানে দুটি সাপ ছিল, যা আমাদের আগের লোকেরাও দেখেছেন। সাপ দুটি কখনো কারও ক্ষতি করেনি বলে শুনেছি। পরে একটি সাপ মেরে ফেলার পর আর তাদের দেখা যায়নি। আগে পুরো জায়গাটাই জঙ্গলে ঢাকা ছিল। জঙ্গল পরিষ্কার করার পর মসজিদটি মানুষের সামনে আসে। তবে কে বা কারা প্রথম এটি খুঁজে পান, তা আমরা জানি না।”
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, শুরুর দিকে এই মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে ২১ থেকে ২২ জন মুসল্লির নামাজ পড়ার ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তীতে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদটি সম্প্রসারিত করা হয়। বর্তমানে এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। বিশেষ করে জোহরের নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়, যার ফলে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের তেলাওয়াতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নামাজ আদায়ের পাশাপাশি প্রাচীন এই স্থাপনাটি দেখার জন্য প্রতিদিন অনেক মানুষ ভিড় করেন। কেউ আসেন ঐতিহাসিক কৌতূহল থেকে, আবার কেউ আসেন ধর্মীয় বিশ্বাসে দোয়া করতে। অনেকে এখানে মানতও করেন। মসজিদের দানবাক্সে প্রতি মাসে প্রায় এক থেকে দুই লাখ টাকা জমা হয় বলে জানা গেছে।
মসজিদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন খাদেমের জীবনের বিশেষ গল্প। তিনি হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করার পর এই মসজিদের খেদমতে নিযুক্ত হন। ওই খাদেম বলেন, “ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি অনেক শান্তিতে আছি। ইসলাম গ্রহণের দুই বছর পর থেকে আল্লাহর রহমতে এই মসজিদের খেদমত করছি। এখানে কাজ করতে আমার অনেক ভালো লাগে।”
মসজিদের ইমাম মো. মূসা জানান, স্থাপনাটির বয়স সম্পর্কে তাঁদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তিনি বলেন, “মসজিদটির বয়স সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। এখানে কোনো নামফলক বা হিজরি সনও লেখা নেই। এলাকার মুরব্বিরা বলেন, এটি শত শত বছরের পুরোনো মসজিদ। মসজিদটির কারুকাজ আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ১০০ থেকে ১৫০, কখনো ২০০ জনের বেশি মুসল্লি অংশ নেন। আর জুমার নামাজে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মুসল্লি আসেন।”
নির্মাণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আজও রহস্যের আড়ালে ঢাকা। তা সত্ত্বেও নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, মানুষের অটুট বিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেওয়ানগঞ্জের এই গায়েবী মসজিদ। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে রহস্যময় এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি জামালপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।