দুটি ছাগল দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের আজিরন বেগম। কিন্তু সেই ছাগল দুটি ঘরে আনার পর তার খোয়ারে নেমে আসে একের পর এক মৃত্যুর মিছিল। চলতি বছরের জুলাই মাসে সরকারি প্রকল্প থেকে পাওয়া ছাগল দুটির সঙ্গে মারা যায় আগে থেকে পালন করা তার আটটি ছাগলও। এখন বেঁচে আছে মাত্র একটি ছাগলছানা। যে সহায়তা তার পরিবারের আয়ের পথ তৈরি করার কথা, সেটিই উল্টো তাকে ঠেলে দিয়েছে ক্ষতির মুখে।

আজিরন বেগমের অভিযোগ, সরকারি ছাগল দুটি ছিল একেবারেই ছোট ও দুর্বল। সেগুলো ঘরে আনার এক সপ্তাহের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর সেই দুই ছাগলের সংক্রমণে তার খোয়ারের অন্য ছাগলগুলোও মারা যায়। একে একে সব ছাগল হারিয়ে এখন তার সম্বল বলতে পড়ে আছে একটি ছাগলছানা।

এসময় আজিরন বেগম কান্না জড়িতকন্ঠে বলেন, আমাকে সরকারি প্রকল্প থেকে দুইটা ছাগল দিছিল। ছাগল দুইটা একেবারেই ছোট ছিল। আমার নিজেরও আগে আটটা ছাগল ছিল। ভাবছিলাম, এই ছাগলগুলা বড় হইলে বাচ্চা দেবে, সংসারে একটু আয় বাড়ব। কিন্তু ছাগল দুইটা বাড়িতে আনার এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার আগের ছাগলগুলাও একে একে মারা গেল। আমার চোখের সামনেই সব শেষ হইয়া গেল। একেকটা ছাগল মরছে, আর আমি অসহায়ের মতো তাকায়া দেখছি। সবগুলারে বাড়ির পেছনে মাটি খুঁইড়া কবর দিছি। এতগুলা ছাগল আমার ঘরে ছিল, আর এখন একটা ছাগলছানা ছাড়া কিছুই নাই। এখন এই ছাগলছানাডা নিয়া কী করমু, কীভাবে আবার শুরু করমু, কিছুই বুঝি না। সরকারি ছাগল পাইয়া ভাবছিলাম, আমার কষ্টের দিন হয়তো একটু কমব। কিন্তু সেই ছাগল পাইয়াই আমার এত বড় ক্ষতি হইল। লাভ তো দূরের কথা, এখন আগের অবস্থায় ফিরব কীভাবে, সেই চিন্তায়ই দিন কাটে।

আজিরনের মতো ক্ষতির মুখে পড়েছেন একই প্রকল্পের উপকারভোগী তারা মিয়াও। তার অভিযোগ, ছাগল বাড়িতে আনার পর থেকেই সেগুলো অসুস্থ হতে শুরু করে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানোর পরও কেউ খোঁজ নিতে আসেননি। পরে নিজের পকেট থেকে তিন হাজার টাকা খরচ করে চিকিৎসক দেখিয়েও ছাগল বাঁচাতে পারেননি তিনি।

তারা মিয়া বলেন, ছাগলগুলা অসুস্থ হওয়ার পর কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ দেখতে আসেনি। পরে নিজের টাকা খরচ কইরা তিন হাজার টাকার চিকিৎসা করাইছি, তারপরও ছাগল বাঁচাইতে পারিনি। আমরা তো ছাগলগুলা সুস্থভাবে পালনের জন্যই নিছিলাম। এখন ছাগলও গেল, আবার চিকিৎসার পেছনেও টাকা খরচ হইল। এই ক্ষতি আমরা কীভাবে পোষাব? আমাদের মতো মানুষের পক্ষে বারবার টাকা খরচ কইরা ছাগল কেনা সম্ভব না। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, আমাদের আবার ছাগল দেওয়া হোক। সম্ভব হলে দুইটা কইরা দিক, আর তা না পারলে অন্তত একটা বড় ও সুস্থ ছাগল দিক, যাতে আমরা আবার পালন করতে পারি।

আজিরন ও তারা মিয়ার মতো দেওয়ানগঞ্জে সরকারি প্রকল্পের আওতায় শেষ ধাপে ছাগল পাওয়া অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও ছাগল মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের দাবি, বিতরণের সময় দেওয়া অনেক ছাগলই ছিল রোগা, দুর্বল ও ওজনে কম। ফলে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় ছাগল পেলেও এখন তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ছাগলের মান ও প্রকল্পের তদারকি নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ৮৬টি সুবিধাবঞ্চিত এলাকা ও নদীবিধৌত চরাঞ্চলের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় পাঁচ ধাপে ৭৭০ জন উপকারভোগীর মধ্যে মোট ১ হাজার ৫৩০টি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিতরণ করা হয়। গত ৩ ও ১৫ জুলাই ছাগল বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে শেষ ধাপে ১২০টি পরিবারের মধ্যে দেওয়া হয় ২৪০টি ছাগল। বিতরণের এক মাসের মধ্যেই ১৭২টি ছাগল মারা যায়।

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ছাগলের ওজন হওয়ার কথা ছিল আট কেজি। কিন্তু উপকারভোগীদের অভিযোগ, শেষ ধাপে পাওয়া অনেক ছাগলের ওজন ছিল মাত্র তিন থেকে চার কেজি। ছাগলগুলো আনার কয়েক দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারও কারও ছাগল মারা যাওয়ার পরও তাঁরা সময়মতো চিকিৎসা সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

দেওয়ানগঞ্জের বিধবা জানাহানারা বেগম বলেন, আমাদের আশপাশে যারা ছাগল পেয়েছে, তাদের অনেকেরই সব ছাগল মরে গেছে। আনার এক সপ্তাহের মধ্যে আমার দুইটাই মারা যায়। অন্য বাড়িতেও ১০ দিনের মধ্যে ছাগল মারা গেছে। ছাগলগুলোর ওজন তিন থেকে চার কেজি হবে। ভালো ছাগল দিলে আমাদের ক্ষতি হতো না।

তবে বিতরণের সময় ছাগলগুলো ভালো ছিল বলে দাবি করেছেন দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, যখন বিতরণ করা হয়েছে, তখন ছাগলগুলো ভালোই ছিল। ওজনও আমরা মেপে দিয়েছি। তবে মাঠপর্যায়ে ছাগলগুলোর মৃত্যুর কিছু অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানতে ঢাকায় নমুনা পাঠিয়েছি। আর বর্তমানে কিছু ছাগল আবারও বিতরণ করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের খোঁজ না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মিজানুর রহমান বলেন, কর্মকর্তারা ছাগলগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে যাদের ছাগল মারা গেছে, তাদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে।

অসুস্থ ছাগল কীভাবে উপকারভোগীদের হাতে গেল এবং ছাগল সরবরাহে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, সে বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক ডা. নন্দ গোপাল টিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, ছাগল মারা যাওয়ার অভিযোগ তারা পেয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করে ক্ষতিপূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আবারও ছাগল দেওয়া হবে।