পৃথিবীর শুরু থেকেই কি পানি বিদ্যমান ছিল, নাকি মহাকাশের কোনো বহিঃ উৎস থেকে এই পানি এখানে এসেছে—এই প্রশ্নটি দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদল বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের আবির্ভাব ঘটার অনেক আগেই পানির অস্তিত্ব ছিল। অন্যদিকে, অনেকের ধারণা সৌরজগতের গ্রহাণুগুলোর মাধ্যমেই পৃথিবীতে পানির আগমন ঘটেছে। তবে সম্প্রতি নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এক ভিন্ন মতবাদ সামনে এনেছেন। তাঁদের দাবি, সৃষ্টির শুরুর সময়ে পৃথিবী সম্পূর্ণ শুষ্ক এবং পানিহীন ছিল। বর্তমানে পৃথিবীতে আমরা যে বিপুল পরিমাণ পানি দেখি, তা আমাদের গ্রহ তার নিজস্ব পাথুরে কাঁচামাল ব্যবহার করে সরাসরি তৈরি করে নিয়েছে।

নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, পৃথিবী গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে আকাশ থেকে নিচে পড়া পাথরের কণাগুলোর সঙ্গে হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলের একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছিল। প্রচণ্ড উত্তাপের সেই পরিবেশে শিলাগুলোর মধ্যে থাকা আয়রন অক্সাইড হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পানি এবং বিশুদ্ধ লোহা উৎপন্ন করে। পরবর্তীতে এই লোহাই পৃথিবীর ধাতব কেন্দ্র বা কোর গঠন করতে সহায়তা করেছে। এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জ্যাকারি শার্প বলেন, “বিশাল জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে এটি কল্পনা করা কঠিন। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে উত্তপ্ত বায়ুমণ্ডলের কারণে এ পানি তৈরি হয়েছিল।”

নিজেদের এই তত্ত্বটি যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা ১২০০ থেকে ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাইড্রোজেনের প্রবাহের মধ্যে শিলার নমুনা উত্তপ্ত করে পরীক্ষা চালিয়েছেন। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় হাইড্রোজেনের প্রবাহে রাখা নমুনার আয়রন অক্সাইডের প্রায় ৮০ শতাংশই ধাতব লোহায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পানি তৈরি হয়েছে। তবে যখন হিলিয়াম-প্রবাহে নমুনাগুলো রাখা হয়, তখন এমন কোনো বিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। এটি প্রমাণ করে যে, উত্তপ্ত হাইড্রোজেন বায়ুমণ্ডলই ছিল পানি তৈরির মূল চাবিকাঠি। এই বিষয়ে বিজ্ঞানী জ্যাকারি শার্প বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম যে রিডাকশন পরীক্ষায় লোহা ও পানি তৈরি হবে, তবে কতটা দ্রুত ও কী পরিমাণে হবে, তা জানার উপায় ছিল না। আমাদের গবেষণার হিসাব থেকে দেখা গেছে, এ প্রক্রিয়ায় শত শত মহাসাগরের সমপরিমাণ পানি তৈরি হয়েছিল।”

জানা গেছে, সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ ধূলিকণা ও পাথরের একটি ঘূর্ণায়মান রিং থেকে তৈরি হয়েছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্রোটোপ্ল্যানেটরি ডিস্ক বলা হয়। সূর্যের তীব্র বিকিরণের কারণে ভেতরের গ্রহগুলোতে পানির অণু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। একারণেই আগে ধারণা করা হতো যে, ধূমকেতু বা উল্কাপিণ্ডের মতো বাইরের কোনো উৎস থেকে পৃথিবীতে পানি এসেছে। তবে পৃথিবীর শুরুর সময়ে এত বিপুল সংখ্যক ধূমকেতুর আঘাত হানার বিষয়টি অনেক বিজ্ঞানীই অসম্ভব বলে মনে করেন।

নতুন এই বৈজ্ঞানিক গবেষণাটি দূরবর্তী তারাকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান অন্যান্য পাথুরে গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী শার্প বলেন, “পেবল অ্যাক্রিশনের ধারণা তুলনামূলক নতুন। এ ধারণা গ্রহ গঠনের বিদ্যমান ধারণার অনেক সমস্যার সমাধান করেছে।”