এক সময়ের বিধ্বংসী পেসাররা, যারা ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করে ব্যাটসম্যানদের ত্রাস সৃষ্টি করতেন, তাঁদের অনেকেরই ক্যারিয়ারের কয়েক বছর পর দেখা যায় গতি কমে গেছে। শুরুর দিকে গতির ঝড়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা বোলাররা পরবর্তীতে স্লোয়ার, ইয়র্কার কিংবা ভিন্ন কৌশলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। আধুনিক ক্রিকেটে পেসারদের গতির এই আকস্মিক পতনের প্রকৃত কারণ কী? পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াকার ইউনিসের মতে, এর পেছনে প্রধানত ক্রিকেটের পরিবর্তিত ধরন, অতিরিক্ত ম্যাচের চাপ এবং বোলারদের মানসিকতার পরিবর্তন দায়ী।
শুভঙ্কর মিশ্রের একটি পডকাস্টে কথা বলার সময় পেসারদের গতি হ্রাসের বিষয়ে ওয়াকার ইউনিস জানান, তাঁর সময়ের ক্রিকেটের সঙ্গে বর্তমান সময়ের ক্রিকেটের মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। আগে টেস্ট ক্রিকেটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো এবং এরপর আসত ওয়ানডে। ফলে বোলাররা নিজেদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেতেন। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার চাপে বিশ্রাম ও প্রস্তুতির সময় হারিয়ে ফেলছেন পেসাররা।
ওয়াকার ব্যাখ্যা করে বলেন, “ভুলে গেলে চলবে না, ক্রিকেট নিজেই বদলে গেছে। আমরা যখন খেলতাম, তখন ক্রিকেট ছিল অন্য রকম। আমাদের সময়ে টি-টুয়েন্টি ছিল না। এটা ছিল বড় একটি পার্থক্য। নিজেদের প্রস্তুত করার জন্যও আমরা যথেষ্ট সময় পেতাম।”
তবে কেবল ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধিকেই গতি কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ মনে করেন না পাকিস্তানের হয়ে ৮৭ টেস্টে ৩৭৩ উইকেট নেওয়া এই সাবেক পেসার। তাঁর মতে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের তীব্র চাপ বোলারদের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বাইরে থেকে চার ওভারের একটি স্পেল ছোট মনে হলেও, প্রতিটি বলে ব্যাটসম্যানের আক্রমণের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। মাত্র একটি বা দুটি বাউন্ডারিই বোলারের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি শুরু হওয়ার দুই বছর আগে অবসর নেওয়া ওয়াকার বলেন, টি-টোয়েন্টিতে চার ওভার বল করাও ওয়ানডেতে টানা ১০ ওভার বোলিং করার চেয়ে বেশি চাপের হতে পারে। কারণ, প্রতিটি বলেই বোলারকে ব্যাটসম্যানের আক্রমণ সামলাতে হয়। ব্যাটসম্যান দুই বাউন্ডারি মেরে দিলেই বোলারের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে।
পাকিস্তানের এই সাবেক গতিতারকার মতে, এই মানসিক পরিবর্তনই গতির ওপর প্রভাব ফেলে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুতে একজন বোলার ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করতে হয়। কখন স্লোয়ার দিতে হবে, কীভাবে ওয়াইড ইয়র্কার করতে হবে কিংবা ব্যাটসম্যানের আক্রমণ কীভাবে ঠেকানো যাবে—এই ভাবনাগুলো তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমস্যাটি সেখানে তৈরি হয়, যখন বোলারের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু উইকেট নেওয়ার বদলে রান আটকানো কিংবা ব্যাটসম্যানের আক্রমণ থেকে বাঁচার লড়াইয়ে পরিণত হয়। তখন তাঁর স্বাভাবিক গতি কমে যেতে পারে। ওয়াকারের ভাষায়, “যখন টিকে থাকার চিন্তা মাথায় ঢুকে যায়, তখন ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিটা আর থাকে না।”
তাঁর মতে, ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করার সময় নিয়ন্ত্রণ বোলারের হাতে থাকা জরুরি, ব্যাটসম্যানের হাতে নয়। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটের কারণে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পেসারদের গতি ধরে রাখতে ক্রিকেট বোর্ডগুলোর বিশেষ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ওয়াকার। তাঁর পরামর্শ হলো, টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বিশেষজ্ঞ বোলিং ইউনিট তৈরি করা উচিত, যারা দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটের উপযোগী প্রস্তুতি নিতে পারবে।
ইংল্যান্ড ইতিমধ্যে এমন ব্যবস্থা করেছে এবং অস্ট্রেলিয়াও কিছুটা সেই পথে এগিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়াকারের পরামর্শ অনুযায়ী, টেস্ট বোলারদের চার দিনের কিংবা দীর্ঘ সংস্করণের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সুযোগ দিতে হবে। সেখানে তাঁরা যেন দিনে ২০ থেকে ২৫ ওভার বোলিংয়ের অনুশীলন করতে পারেন এবং সেই সঙ্গে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতি ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।