মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক দিনমজুর এবং তাঁর চার বছর বয়সী কন্যা সন্তানকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার রাতে উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, বাবার সঙ্গে দাদার বাড়ি থেকে রাতে নানার বাড়ির দিকে যাচ্ছিল ছোট্ট তোয়াবা। পথে একদল হামলাকারী তাঁদের ওপর আক্রমণ করে, যার ফলে বাবা ও মেয়ে আলাদা হয়ে যান। গুরুতর আহত অবস্থায় কোনো রকমে বাড়ি ফিরলেও শিশু তোয়াবাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। নিখোঁজ হওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার একটি কাশবনে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ দুপুরে হাসপাতালে মারা যান শিশুটির বাবা গোলাপ হোসেন।

গতকাল রাতে রামকৃষ্ণদী গ্রামে এই হামলা চালানো হয়। আজ সকাল নয়টার দিকে ওই গ্রামের একটি ইটভাটার পাশে কাশবনে পুলিশ শিশু তোয়াবার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে। অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ দুপুরে গোলাপ হোসেনের মৃত্যু হয়।

নিহত গোলাপ হোসেন (৩২) সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে। তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে একই ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পেশায় দিনমজুর গোলাপ সম্প্রতি বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

পরিবারের দাবি, জমিজমার বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন বাবা ও মেয়েকে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় পুলিশ একজনকে আটক করেছে। গোলাপ হোসেন মৃত্যুর আগে বেঁচে থাকা অবস্থায় জানিয়েছিলেন যে, এই হামলায় সোহরাবসহ আরও কয়েকজন জড়িত ছিল। বর্তমানে সোহরাবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং বাকি অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, গোলাপ হোসেন তাঁর খালাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ও নানার বাড়ি একই স্থানে। নানার বাড়ির জমিজমা নিয়ে গোলাপের মামাদের সঙ্গে প্রতিবেশী সোহরাব হোসেনের পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে দুই পক্ষ আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলাও করেছে এবং এর আগেও তাঁদের মধ্যে মারামারি হয়েছে।

স্বজনদের ভাষ্যমতে, গতকাল বিকেলে মেয়ে তোয়াবাকে নিয়ে রামকৃষ্ণদীতে বাবার বাড়িতে যান গোলাপ হোসেন। এশার নামাজের পর মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হলে ইটভাটা এলাকায় সোহরাব হোসেনের লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করে। এতে ছোট্ট মেয়েটি বাবার হাত ছেড়ে আলাদা হয়ে যায়। আহত গোলাপ কোনোমতে বাড়ি ফিরলে স্বজনরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে কেরানীগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

রাতভর খোঁজাখুঁজির পর আজ সকালে স্থানীয় লোকজন কাশবনে তোয়াবার গলাকাটা লাশ দেখতে পান। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। এদিকে আজ বেলা ১১টার দিকে গোলাপের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়, যেখানে বেলা দেড়টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নিহত গোলাপের মা হাসু বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সোহরাবরা আমার ভাইদের সম্পত্তি নিয়ে গেছে। আমার ভাইয়েরা মামলা করায় তারা আমার ছেলেকে কয়েকবার মারধর করেছে। আমাকেও একাধিকবার মারার চেষ্টা করেছে। আমার ছেলে নাতনিকে নিয়ে বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল, তখন সোহরাব দলবল নিয়ে হামলা করে ওদের দুজনকে কুপিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সামান্য জমির জন্য তারা আমার ছেলে ও নাতনিকে কুপিয়ে মেরেছে। আমি এর বিচার চাই।”

এই ঘটনায় অভিযুক্ত সোহরাব হোসেনকে পুলিশ আটক করেছে, তবে পুলিশের হেফাজতে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হাসান জানান, শিশু তোয়াবার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড দুটি ঘটেছে। গোলাপ বেঁচে থাকা অবস্থায় হামলায় সোহরাবসহ কয়েকজনের জড়িত থাকার কথা জানিয়ে গেছেন। সোহরাবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।”