চলতি বছরটিকে হরর সিনেমা ও সিরিজের বছর বলা হলে খুব একটা ভুল হবে না। প্রেক্ষাগৃহে ‘অবসেশন’, ‘ব্যাকরুমস’ এবং ‘রেসিডেন্ট ইভিল’-এর মতো সিনেমার ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও বেশ কিছু সিনেমা ও সিরিজ দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। এই ধারার সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে এসেছে ওয়েব সিরিজ ‘ক্রিস্টাল লেক’। মুক্তির প্রথম ১১ দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম পিককে এই সিরিজটি মোট ১৩০ কোটি মিনিট দেখা হয়েছে। এর ফলে পিকক প্ল্যাটফর্মের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দেখা মৌলিক চিত্রনাট্যনির্ভর সিরিজের তালিকায় চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে এটি। জনপ্রিয় হরর ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’-এর পটভূমিতে নির্মিত এই সিরিজটি এক ভয়ংকর মা ও তাঁর ছেলের গল্পকে নতুন করে সামনে এনেছে।

পিককের সাফল্যের তালিকায় চতুর্থ স্থানটি দখল করতে ১৫ অক্টোবর ‘ক্রিস্টাল লেক’-এর মোট আটটি পর্ব একসঙ্গে মুক্তি পায়। প্রথম ১১ দিনের দর্শক দেখার সময়ের হিসেবে এই সিরিজের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে পিককের আরও তিনটি মৌলিক সিরিজ—‘দ্য বেস্ট ম্যান: দ্য ফাইনাল চ্যাপ্টারস’, ‘অল হার ফল্ট’ এবং ‘দ্য ফাইভ স্টার উইকেন্ড’-এর প্রথম মৌসুম। অর্থাৎ, মুক্তির শুরুতেই প্ল্যাটফর্মটির সফলতম চিত্রনাট্যনির্ভর প্রযোজনাগুলোর কাতারে জায়গা করে নিয়েছে এই নতুন সিরিজটি।

শুধুমাত্র মোট দেখার সময়ের হিসাবেই নয়, সাপ্তাহিক চার্টেও সিরিজটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। নিলসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রিমিং অরিজিনাল সিরিজের মধ্যে তৃতীয় স্থানে ছিল ‘ক্রিস্টাল লেক’। একই সময়ে নতুন মৌসুমের সিরিজগুলোর মধ্যেও এটি তৃতীয় অবস্থানে ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিরিজটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। স্প্রাউট সোশ্যালের হিসাব অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় এটি ১৮০ কোটি অর্জিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইমপ্রেশন পেয়েছে। এছাড়া প্রথম ১১ দিনে সিরিজটির ভিডিও দেখা হয়েছে ৭৬ লাখবারের বেশি।

পুরোনো হরর ফ্র্যাঞ্চাইজির এই নতুন গল্পটি বুঝতে হলে দর্শককে ফিরে তাকাতে হবে ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’-এর দিকে। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া এই হরর সিনেমা সিরিজের প্রথম ছবিতে ক্রিস্টাল লেকের গ্রীষ্মকালীন শিবিরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখানো হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ বছর ধরে জেসন ভুরহিস হরর সিনেমার অন্যতম পরিচিত চরিত্রে পরিণত হন। মুখে হকি মাস্ক এবং হাতে ধারালো অস্ত্র—এই বিশেষ অবয়বের কারণে জেসন শুধু একটি চরিত্র হিসেবে নয়, বরং হরর ঘরানার এক জনপ্রিয় প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পান।

তবে নতুন এই সিরিজটি জেসনের সেই পরিচিত খুনি রূপ দিয়ে শুরু হয়নি; বরং এটি আলোকপাত করছে তার শৈশব, তার মা পামেলা ভুরহিস এবং সেই ট্র্যাজেডির ওপর, যা পরবর্তী সময়ে ক্রিস্টাল লেককে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত করেছিল।

দর্শকেরা আগে থেকেই জানেন যে এই জগতের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ফলে নির্মাতাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল শুধু ভয় দেখানো নয়, বরং পরিচিত কাহিনির পেছনের মানুষগুলোকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। জেসন কীভাবে এই পরিচিত হরর-চরিত্র হয়ে উঠল এবং তার মায়ের জীবন কীভাবে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই সিরিজে।

সিরিজের গল্প শুরু হয় জেসনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। অসুস্থ ও দুর্বল শিশু জেসন ক্রিস্টাল লেকের পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর পরও তার মা পামেলা সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। একজন একক মা হিসেবে ছেলেকে হারানোর তীব্র বেদনা তাঁকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতে চাননি যে জেসন সত্যিই আর ফিরবে না।

এমন সময়ে দুজন অপরিচিত ব্যক্তি পামেলার অতীত সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে তাঁর কাছে আসেন। তাঁদের আগমন থেকেই শুরু হয় একের পর এক অস্বস্তিকর ঘটনা। শহরের মানুষ ধীরে ধীরে পামেলাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। তিনি আসলে কে? তাঁর অতীতের কোন ঘটনা এত দিন আড়ালে ছিল? আর ছেলেকে হারানোর শোক কি তাঁকে এমন কোনো পথে ঠেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো উপায় নেই? এই গল্পে ভয় তৈরি করা হয়েছে শুধু হত্যাকাণ্ড বা রক্তপাতের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের শোক, নিঃসঙ্গতা, সন্দেহ এবং প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থেকেও। পামেলা এখানে কেবল জেসনের মা নন, তিনি নিজেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচিত হরর-জগৎকে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে এই সিরিজটি।

পামেলা ভুরহিস চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিন্ডা কার্ডেলিনি। ‘ডেড টু মি’ ও ‘ফ্রিকস অ্যান্ড গিকস’-এর মতো কাজের মাধ্যমে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে এবার অনেক বেশি অন্ধকার ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে। তাঁর অভিনীত পামেলা একদিকে যেমন সন্তানহারা মা, অন্যদিকে তেমনই এক রহস্যময় নারী, যাঁর অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক অস্বস্তিকর যোগসূত্র রয়েছে।

তরুণ জেসন ভুরহিসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যালাম ভিনসন। এ ছাড়া অভিনয় করেছেন উইলিয়াম ক্যাটলেট, ডেভিন কেসলার, ক্যামেরন স্কগিনস, গোয়েনডোলিন সানডস্ট্রম, নিক কর্ডিলিওন, জয় সুপ্রানো, ড্যানিয়েল কচ ও ফিনিক্স পারনেভিক।

শহরের বাসিন্দা, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পামেলার অতীতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপস্থিতি গল্পটিকে বিভিন্ন দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এতে ক্রিস্টাল লেক শুধু ভয়ংকর ঘটনার পটভূমি হয়ে থাকে না, বরং এমন এক জনপদে পরিণত হয় যেখানে প্রত্যেকের নিজস্ব গোপন কথা আছে এবং অতীতের ঘটনা বর্তমানকে প্রভাবিত করে।

‘ক্রিস্টাল লেক’ নির্মাণ করেছেন ব্র্যাড ক্যালেব কেইন। তিনি এই সিরিজটির স্রষ্টা, চিত্রনাট্যকার ও শোরানার। এর আগে তিনি ‘ইট: ওয়েলকাম টু ডেরি’, ‘টোকিও ভাইস’ ও ‘ওয়ারিয়র’-এর মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিরিজটি প্রযোজনা করেছে স্বাধীন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এ২৪।

নির্মাতাদের লক্ষ্য ছিল পুরোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির পরিচিত উপাদানগুলো ধরে রেখেও গল্পটিকে নতুনভাবে বলা। সিরিজটিতে স্ল্যাশার হররের সহিংসতা থাকলেও তার পাশাপাশি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, শহরের পরিবেশ এবং অতীতের ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পামেলা ও জেসনের সম্পর্ককে সামনে রেখে পরিচিত খুনি চরিত্রের পেছনে থাকা পারিবারিক ট্র্যাজেডির দিকটিও অনুসন্ধান করা হয়েছে।

পরিচালনার দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন মাইকেল লেনক্স, সেলিন হেল্ড, লোগান জর্জ ও কুয়েন ট্রান। আট পর্বের পুরো মৌসুম একসঙ্গে মুক্তি দেওয়ায় দর্শকেরা চাইলে ধারাবাহিকভাবে পুরো গল্পটি দেখতে পারছেন।