দশ বছর আগে 'আইসক্রিম' সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডে নিজেদের পরিচিতি গড়েছিলেন শরীফুল রাজ, কুমার উদয় এবং নাজিফা তুষি। বর্তমানে রাজ ও তুষি চলচ্চিত্র অঙ্গনের নিয়মিত মুখ হয়ে উঠলেও, সেই সিনেমার আরেক নায়ক উদয়কে আর কোনো পর্দায় দেখা যায়নি। দীর্ঘ এই অনুপস্থিতির পেছনে কি কোনো অভিমান ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণ? এই প্রশ্নই এখন অনেকের মনে।
সম্প্রতি চরকি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মিত সেই সিনেমাটি। এর ফলে সিনেমা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদয়কে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০ অক্টোবর উদয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি বর্তমানে ঢাকাতেই অবস্থান করছেন। প্রথম সিনেমায় যুক্ত হওয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, সেই সময়ে তিনি ফার্মগেট এলাকায় থাকতেন। একদিন আইসক্রিম সিনেমার একজন সহকারী পরিচালকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তখন রেদওয়ান রনির টিম সিনেমাটির জন্য নতুন মুখ খুঁজছিল এবং সেই সহকারী পরিচালকের মাধ্যমেই তিনি অভিনয়ের প্রস্তাব পান।
সেই সময়ের কথা মনে করে উদয় বলেন, ‘তখন আমি মডেলিং করতাম। পরে রনি ভাইয়ের অফিসে গেলাম। চিত্রনাট্য থেকে অভিনয় করে দেখালাম। তাঁরা পছন্দ করলেন। এভাবেই শুরু হলো আমার সিনেমার যাত্রা।’ ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি দর্শকদের বেশ পছন্দ হয়েছিল।
সিনেমাটির সহশিল্পী শরীফুল রাজ ও নাজিফা তুষি ক্যারিয়ারে এগিয়ে গেলেও উদয় কেন পিছিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথম সিনেমার পর আমার ক্যারিয়ারের ভালো সময় ছিল। তখন বেশ কিছু সিনেমার প্রস্তাব পেয়েছিলাম। সিনেমা নিয়েই থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের প্রয়াণ আমাকে ব্যথিত করে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত কিছু কারণে আমার সিনেমা করা সম্ভব হয়নি। তখন পরিবারে সময় দিয়েছি। পরিবারের দেখভাল করতে হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগত কারণে তিনি কিছুদিন দেশের বাইরেও ছিলেন। তবে রুপালি পর্দায় ফেরার ইচ্ছা এখনো তাঁর প্রবল। উদয় বলেন, ‘আমি সিনেমায় ফিরতে চাই। সিনেমা এখনো আমার ক্যারিয়ারের পছন্দের জায়গা। আবার সিনেমায় ফেরার সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি।’
নতুন করে শুরু করার আগে নিজেকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। উদয়ের ভাষায়, ‘শুরুতে আমার অভিনয় নিয়ে নিজেই খুশি ছিলাম না। মনে হতো, অভিনয় জানি না, আরও শেখা দরকার। এটা বোঝার পরই মনে হলো, আমাকে ঠিকঠাক অভিনয় শিখে সিনেমায় নামতে হবে। সেই চর্চার মধ্যেই এখনো আছি। পড়াশোনা করছি। নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করি। যাঁরা মঞ্চনাটক দেখেন, তাঁরা জানেন, আমি অভিনয়ে নিয়মিত।’
অভিনয়ের খুঁটিনাটি জানতে উদয় প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি নাট্যদল 'তাড়ুয়া'-র সঙ্গে যুক্ত। মঞ্চে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে 'আদমসুরত', 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট' এবং 'কাঁটায় কাঁটায়' সহ আরও বেশ কিছু নাটক। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বর্তমানে ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত আছেন। দীর্ঘ বিরতির কারণে ইন্ডাস্ট্রির মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে যাওয়ায় সুযোগ পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবাই এটাই জানে, আমি সিনেমা ছেড়ে দিয়েছি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এখন আমি সিনেমার জন্য পুরো প্রস্তুত। বলা যায়, অভিনয়ের জন্য মরিয়া হয়ে আছি।’
একসঙ্গে ক্যারিয়ার শুরু করলেও রাজ ও তুষির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তেমন ছিল না। তবে সম্প্রতি চরকিতে সিনেমাটি মুক্তির পর পরিচালক রেদওয়ান রনি তাঁর জন্মদিনে সিনেমার প্রধান তিন শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তাঁদের মধ্যে জমে ওঠে দীর্ঘ আড্ডা।
সেই আড্ডায় ১০ বছর আগের স্মৃতিগুলো আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে। উদয় বলেন, ‘সিনেমা রাতে রিলিজ হলো, সবাই একসঙ্গে দেখলাম। অনেক দিন পর আমাদের দেখা হলো। সব মিলিয়ে একটি ইমোশনাল জার্নি ছিল। হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই শুটিংয়ের দিনগুলোয়। শুটিংয়ের মজার নানা ঘটনা নিয়ে কথা হলো তুষি (নাজিফা তুষি), রাজের (শরীফুল রাজ) সঙ্গে। রনি (রেদওয়ান রনি) ভাই বললেন, দেরি না করে আবার সিনেমায় নিয়মিত হতে।’
নিয়মিত কাজ করলে রাজ বা তুষিদের মতো জনপ্রিয় হতে পারতেন—এমনটা মনে হয় কি না জানতে চাইলে উদয় বলেন, ‘আমি কখনোই মিস করি না। এটাও ভাবি না, মিস করা উচিত ছিল। হয়তো নিয়মিত কাজ করে গেলে দেশের মানুষ আমাকে চিনত, কিন্তু আমার অভিনয় নিয়ে আমি কি খুব বেশি ভালো জায়গায় যেতে পারতাম? একটা জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। কারণ, নিজেই অভিনয় নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না; বরং ভালো হয়েছে, এখন শিখে সিনেমায় ফিরছি। কোনো কিছু জেনে ও বুঝেই করা উচিত। তাহলেই ভালো কিছু হবে।’
সিনেমা পর্দায় তাঁকে কবে দেখা যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তরে উদয় জানান, ‘ইতিমধ্যে একটি সিনেমার টিমের সঙ্গে কথা বলেছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে শিগগির হয়তো শুটিংয়ে যাব।'