ভারত সরকারের সমালোচকদের প্রতি 'দেশবিরোধী' কিংবা 'টুকরে টুকরে গ্যাং' বলে তকমা দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলিউডের প্রবীণ ও বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। এবার তিনি সেই একই তকমাগুলো উল্টো করে সরকারের দিকেই ছুড়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বা ‘গর্বিত নকশাল’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চলমান দমন-পীড়ন এবং দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন এই অভিনেতা।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই ভিডিওতে নাসিরুদ্দিন শাহ ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই) এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের করুণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা খর্ব করার প্রচেষ্টা দেশের তরুণ প্রজন্মের মনোবলকে ভেঙে দিতে পারবে না।
‘সরকারকেই বলছি টুকরে টুকরে গ্যাং’
ভিডিও বার্তায় শাহ উল্লেখ করেন, সরকারের স্বঘোষিত রক্ষকেরা তাঁর মতো মুক্তমনা মানুষদের নানাভাবে আক্রমণ ও তকমা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর কথায়, ‘এ ছাড়া আর কী কী তকমা আমার মতো মানুষের গায়ে সেঁটে দিয়েছেন এই চৌকিদারেরা—দেশবিরোধী, টুকরে টুকরে গ্যাং, আর কে জানে কী কী!’
এরপর সরাসরি সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে অভিনেতা দাবি করেন, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং তো সরকার নিজেই।’ দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘দেশের তরুণদের মনোবল ভাঙতে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করতে এবং গণতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে আপনারা আর কত দূর যাবেন?’ সরকারের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষদের সমালোচনা করে তাঁদের একদল নির্বোধ ও অসৎ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন নাসিরুদ্দিন শাহ।
জেএনইউ, এসআরএফটিআই ও জামিয়ার প্রসঙ্গ
ভিডিওতে তিনি পর্যায়ক্রমে তিনটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, প্রথমে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট এবং বর্তমানে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীরা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এই অন্যায় ঘটনাগুলো মনে রাখা হবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কলকাতার এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাব, ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ। অন্যদিকে, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা এবং ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন। জানা গেছে, ২০০৬ সালের পর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিপ্লবী কবিতায় প্রতিবাদের বার্তা
নিজের বক্তব্যে প্রতিবাদী সুর ফুটিয়ে তুলতে বিপ্লবী কবি বিসমিল আজিমাবাদির বিখ্যাত ‘সারফরোশি কি তামান্না’ কবিতার একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করেন শাহ। স্বাধীনতার লড়াই ও প্রতিরোধের প্রতীক এই কবিতার মাধ্যমে ক্ষমতাধরদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখা যাক, হত্যাকারীর বাহুতে কতটা শক্তি আছে।’
ভিডিওর শেষ পর্যায়ে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ এবং বিজেপির আইটি সেলের তীব্র সমালোচনা করেন নাসিরুদ্দিন শাহ। কিছু সাংবাদিককে কটাক্ষ করে তাঁদের সরকারের ‘পোষা কুকুর’ বলে অভিহিত করেন তিনি। পাশাপাশি বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেলে কর্মরত ব্যক্তিদের অজ্ঞ ও অযোগ্য বলে আক্রমণ করেন।
দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে ভিডিও বার্তায় নাসিরুদ্দিন শাহর শেষ কথাগুলো ছিল— ‘আপনারা আপনাদের সবকিছু নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আমাদের দেশের তরুণদের মনোবল ভাঙা যাবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা যাবে না এবং গণতন্ত্রকে বিপন্ন করা যাবে না।’
শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস
শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে এবং আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নাসিরুদ্দিন শাহর এই প্রথম কথা বলা নয়। সম্প্রতি এসআরএফটিআইয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এছাড়া চলতি বছরের জুলাই মাসে জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি) ২০২৬-এর অনিয়মের অভিযোগ এবং সেই বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এই অভিনেতা।