চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত আবু ইউসুফ ওরফে জীবন (২৭) মৃত্যুবরণ করেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে এক নৃশংস হামলার শিকার হওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলেছিলেন। তবে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত আবু ইউসুফ পেশায় একটি আইসক্রিম কারখানায় কর্মরত ছিলেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। নিহত আবু ইউসুফের বাবা গোলাম নবী মুক্তকণ্ঠকে জানান, হামলাকারীরা তাঁর ছেলের পায়ের রগ কেটে দিয়েছিল, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ডান পা কেটে ফেলার পরও ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শোকসন্তপ্ত বাবা বলেন, ‘যুবদল নেতার পক্ষ ছেড়েছিল, সেই শোধ নিতে ছেলের প্রাণটাই কেড়ে নিল তারা।’

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে আবু ইউসুফসহ চার-পাঁচজন একত্রে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ইকরাম বাবু, আরমান, মেহেদী, নাবিদসহ ১৩ থেকে ১৪ জনের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। জানা গেছে, তাদের কয়েকজনের মাথায় হেলমেট ছিল এবং হাতে ছুরি ও পিস্তল ছিল। হামলাকারীরা প্রথমে আবু ইউসুফকে কিল-ঘুষি মারেন এবং পরবর্তীতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত মারাত্মক আঘাত করেন। এরপর তাঁরা তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

আহত অবস্থায় আবু ইউসুফের ধারণ করা একটি ভিডিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে তিনি সরাসরি ইকরাম বাবু ও আরমানের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ছুরিকাঘাত ও গুলি করার অভিযোগ উত্থাপন করেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আবু ইউসুফ গত দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম নগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান ওরফে জুয়েলের অনুসারী হিসেবে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি যুবদলের রাজনীতি ত্যাগ করে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুজ্জামান ওরফে শিমুলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এই পরিবর্তনের ফলে জিল্লুর রহমানের ভাগনে মেহেদী ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে আবু ইউসুফের বিরোধ তৈরি হয়। পরিবারের অভিযোগ, এই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

এই অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, আবু ইউসুফ যুবদলের কোনো সদস্য ছিলেন না। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর মোবারক আলীর সঙ্গে থাকতেন। তবে আবু ইউসুফ তাঁর ভাগনের বন্ধু হওয়ায় তিনি তাঁকে সহায়তা করতেন। জিল্লুর রহমান দাবি করেন, ‘তবে তাকে আমি মারিনি। নিজেরা নিজেরা মারামারি করেছে।’

আজ দুপুরে ঘটনার স্থানে গিয়ে সড়কের পাশের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে এক মুদিদোকানদার জানান, আবু ইউসুফসহ কয়েকজন সেখানে বসে ছিলেন, এমন সময় মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন এসে তাঁকে মারধর শুরু করেন। পরে স্থানীয় লোকজন জড়ো হতে থাকলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর নিহত আবু ইউসুফের মা কামরুন নাহার ১৫ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় যুবদল নেতা জিল্লুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আবু ইউসুফের মৃত্যুর পর মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ছুরিকাঘাতে আহত আবু ইউসুফ আজ দুপুরে হাসপাতালে মারা গেছেন। এ ঘটনায় সাহেদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।