পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই ঘটনায় কারা জড়িত ছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে গঠিত কমিটি। পাশাপাশি মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতাও যাচাই করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। ওই প্রতিবেদনগুলোতে উত্থাপিত বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্‌ঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের নির্দেশনায় এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। কমিটির বাকি দুই সদস্য হিসেবে থাকবেন মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) একজন সদস্য।

কমিটির মূল লক্ষ্য হবে মানিক পশারীর মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান করা, তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাই করা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় তদন্ত করা। তাঁর সনদ যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া ঘটনার নেপথ্যে কারা সক্রিয় ছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তাও তদন্ত করা হবে। তদন্ত কার্যক্রমের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় মুক্তিযুদ্ধের আলোকে ও আদর্শে পরিচালিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে মন্ত্রণালয় যেমন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাতিলের জন্য কাজ করছে, তেমনি কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ও মর্যাদা যাতে অবমূল্যায়িত না হয়, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান সুস্পষ্ট।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “কোনো মুক্তিযোদ্ধা অনৈতিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে বা কোনো সংগঠন কিংবা গোষ্ঠীর হয়ে ব্যবহৃত হলে, তার দায় তাঁকেই নিতে হবে। পাশাপাশি কোনো জালিয়াত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের স্রষ্টাদের নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সজাগ রয়েছে।”

উল্লেখ্য, মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মানিক পশারী। দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

মানিক পশারীকে পিরোজপুরে গার্ড অব অনার প্রদান করাকে কেন্দ্র করে গত শনিবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কিছু মানুষ তাঁকে সেখানে দাফন না করার দাবি জানান। সেই সময়ে পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায়।

তবে পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জহিরুল হক সে সময় বলেছিলেন, “মানিক পশারীর দাফনের বিষয়ে আমাদের কোনো বাধা ছিল না। তবে দাফনের ব্যাপারে আমাদের কোনো সহযোগিতাও ছিল না। কাদের ছত্রচ্ছায়ায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় দাফন হয়েছে, তা আমরা কিছুই জানি না।”