বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। বুধবার ছিল গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ দিন। এদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের সামনে কয়েক শ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সচিবালয়ের বিপরীতে অবস্থিত পরিবহন পুল ভবনে অবস্থিত মন্ত্রণালয়ের সামনে এই ভিড় জমেছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে মোট কতজন আবেদন করেছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন প্রক্রিয়া গত কয়েক বছর ধরে চলমান ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই আবেদন গ্রহণ অব্যাহত রাখা হয়। সাধারণত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) বৈঠকে গেজেটভুক্তির সুপারিশ করা হতো এবং সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করত।

তবে গত ১ অক্টোবর মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ৭ অক্টোবরের পর থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আর কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। এই বিজ্ঞপ্তির পর সারা দেশ থেকে তালিকায় নাম তোলার জন্য ব্যাপক চাপ শুরু হয়। মূলত ২ অক্টোবর থেকে আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বুধবার শেষ দিন হওয়ায় ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি।

যশোর থেকে আবেদন করতে আসা ৭৩ বছর বয়সী আলতাফ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগেও তিনি গেজেটভুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।”

মানিকগঞ্জ থেকে আসা ৭৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম কেন আবেদন করতে এসেছেন, তা জানতে চাইলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যতবার আবেদন করেছেন, ততবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।” বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাঁর নাম গেজেটভুক্ত করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

চাঁদপুর থেকে আসা আবেদনকারী হায়দার খান বলেন, “কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আগে তাঁর নাম গেজেটভুক্ত করতে দেয়নি।” মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বারবার তাঁর নাম কেটে দেওয়া হতো বলে তিনি দাবি করেন।

বিকেলে মন্ত্রণালয়ের নিচতলায় দেখা যায়, মূল ফটকে পুলিশের দুজন সদস্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করছেন। সেখানে প্রচুর আবেদনের স্তূপ জমে ছিল। কিছুক্ষণ পরপর এই আবেদনগুলো ভবনের পঞ্চম তলায় মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সেখানে আবেদনে মন্ত্রীর সুপারিশসংবলিত স্বাক্ষর দেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তীতে আবেদনকারীকে তা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আবেদনকারীরা সেই সুপারিশপত্র নিয়ে জামুকায় জমা দিচ্ছিলেন।

পঞ্চম তলায় মন্ত্রীর দপ্তরে দেখা যায়, হাতে আবেদনপত্র নিয়ে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। জানা গেছে, মন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়, তাই সবাই সুপারিশ নিয়ে জামুকায় আবেদন জমা দিচ্ছেন। মন্ত্রীর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তাঁর কক্ষে প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে এবং আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে সুপারিশকৃত আবেদনগুলো ছেড়ে দেওয়া হবে।

কয়েকটি আবেদনপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আবেদনকারীরা নিজেদের বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, সেই তথ্যসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ যুক্ত করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেও রাজনৈতিক কারণে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে দুপুরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানান, ৭ অক্টোবরের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নতুন করে আর কোনো আবেদন নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুন করে আবেদন নেওয়া হবে? বিষয়টি স্বাধীনতার পর দু-এক বছরের মধ্যেই শেষ হওয়া উচিত ছিল।”

যাঁরা ইতিমধ্যে আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, “কেউ বাদ পড়ে থাকলে, যতজনই আবেদন করুন না কেন, যাচাই করে তাঁদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ কাজ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে করা হবে।”

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে কতজন গেজেটভুক্তির আবেদন করেছেন, তা এখনই জানা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়ের সামনে উপস্থিত একাধিক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তকণ্ঠকে জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান শুরু হওয়ার পর থেকেই তালিকায় নাম তোলার চাপ বাড়তে থাকে। তখন থেকেই অমুক্তিযোদ্ধারা তালিকায় ঢোকার চেষ্টা শুরু করেন। এবার যেন কোনো অমুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে না পারেন, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।