রাষ্ট্রপতির ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর)। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আসনটির মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এর মধ্যে ১১৫টি কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুবিধার্থে ১৮৫টি কেন্দ্রে মোট ৯৮৯টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এ উপনির্বাচনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন: বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে প্রার্থীরা ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার জন্য ব্যাপক ব্যস্ততা কাটিয়েছেন। তাদের প্রচারণায় এলাকার উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ নিরসনের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এখন প্রার্থীরা ও তাদের সমর্থকেরা কেবল ভোটারদের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তবে নির্বাচনের আগের দিন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা এক সংবাদ সম্মেলন করেন, যেখানে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা, ভোটার স্লিপের সাথে বিরিয়ানির প্যাকেট বিলি এবং প্রিজাইডিং অফিসারদের নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথা।

এই অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করার পর আনুমানিক রাত ১২টার দিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন থেকে ৯ জন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি দলের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সরিয়ে দিয়ে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যাহার করা কর্মকর্তাদের তালিকায় দেখা যায়, তাদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও একজন ব্যাংক কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা হলেন— ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সবুজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মাসুদ রানা, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন, ঠাকুরগাঁও রোড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জুলফিকার আলী, গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ফরিদা ইয়াসমিন, সালন্দর পাঁচপীর ডাঙ্গা স্বতন্ত্র এবতেদ্বায়ী মাদরাসা ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম, সিংগিয়া মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, দৌলতপুর সলেমান খান বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ওবাইদুর রহমান, বালাপাড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা শাহাদুল ইসলাম এবং বড়গ্রাম আলিম মাদরাসার সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার।

ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের এই প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন অফিসার কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। সে জায়গাগুলোতে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”

ভোটগ্রহণের ঠিক আগের রাতে কর্মকর্তাদের এই আকস্মিক প্রত্যাহার ও নতুন নিয়োগের ঘটনায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই নির্বাচনে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং ভোটারদের নিরাপদ ভোটদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটগ্রহণের সময় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা কিংবা ভোটারদের বাধার সম্মুখীন হতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা, নির্বাচনি সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটগ্রহণ শেষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফলাফল প্রস্তুত করার দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি কর্মকর্তারা।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই উপনির্বাচন ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং ভোটের পরিবেশ কেমন থাকে, সেদিকে সবার নজর থাকবে। বিশেষ করে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে আজকের উপনির্বাচনে ভোটারদের রায়েই নির্ধারিত হবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।