বাংলাদেশ পুলিশে ৪ হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) এবং ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কার্যকর করতে পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) সংশোধন করা হয়েছে।
পুলিশ প্রবিধানের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসআই পদের ৫০ শতাংশ শূন্যপদ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হতো। নিয়ম মেনে চললে এবারও চার হাজার পদের অর্ধেক পদোন্নতির জন্য রাখা হতো। তবে এবার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; প্রথমবারের মতো পুরো চার হাজার এসআই পদই সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।
সচিব কমিটির সভায় এসআই ও কনস্টেবল মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার নতুন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানান, “এই ১৪ হাজার পদে নিয়োগ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করা হবে।” তবে প্রবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের এই সিদ্ধান্তের ফলে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি চার হাজার এসআই নিয়োগ দিলে পদোন্নতিপ্রত্যাশীরা বঞ্চিত হবেন। ভবিষ্যতে সরকার যদি একইভাবে সরাসরি নিয়োগের ধারা বজায় রাখে, তবে বঞ্চনা আরও বাড়বে এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে হতাশা দেখা দিতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে কনস্টেবল, এসআই ও পুলিশ সার্জেন্ট পদে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য নিয়োগ পেয়েছিলেন, যা পুলিশ বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কর্মকর্তাদের দাবি, বিগত দেড় দশকে পুলিশের নিয়োগের একটি বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া কনস্টেবল পদে ১০ হাজার নতুন নিয়োগ হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এসব পদ নতুন সৃজন করা হয়েছে। সরাসরি নিয়োগের সুবিধার্থে পুলিশ প্রবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে এবারই একবারের জন্য এভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য সরকার প্রয়োজন মনে করলে ভবিষ্যতেও সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবে।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর দেখতে পায়, পুলিশ প্রশাসনে তাদের নিজেদের আদর্শের লোকবলের সংখ্যা খুবই কম। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের আট মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দেশে ও দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব বিশেষ কারণ বিবেচনা করেই এসআই পদে নতুন করে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, পুলিশ প্রবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয় পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবের মাধ্যমে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৪ হাজার নতুন জনবলের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেতের পর বুধবার সচিব কমিটির সভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। উল্লেখ্য, প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি হলো ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি, যেখানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কমিটি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদন করে থাকে।
পাশাপাশি, পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে নিয়োগের জন্য একটি বিশেষ বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি হতে পারে ৫২তম বিসিএস। এই প্রক্রিয়ায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগপ্রাপ্তদের বনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময় কিছুটা কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশে যাঁদের নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হবে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করেই চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হবে।