চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্য গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংঘাত এবং এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
বুধবার বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনটি সামনে এসেছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এক বিবৃতিতে সংস্থাটির উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে জানান, ‘পণ্যের বাজার একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়ছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যে বাধার কারণে নানা ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য পাওয়ার অনিশ্চয়তা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।’
প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ২০২৬ সালে খাদ্যের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং আগামী বছর এই বৃদ্ধির হার আরও ৭ শতাংশ হতে পারে। খাদ্যশস্য সরবরাহের পথে সংঘাতজনিত বাধা, তীব্র এল নিনোর প্রভাব এবং জ্বালানি ও সারের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধিকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। ধারণা করা হচ্ছে, এর প্রভাবে এ বছর পৃথিবীর একটি বড় অংশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনকারীরা ভয়াবহ বন্যা, খরা এবং অতিরিক্ত গরমের চাপের মুখে পড়তে পারেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছর জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, তবে ২০২৭ সালে তা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পূর্বাভাসটি দেওয়ার ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়েছে যে, ইরান ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংঘাত পুনরায় তীব্র হবে না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং ইরান ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলেও কার্যত বাধা সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহের জন্য এই প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর প্রভাব খুব শক্তিশালী হলে অথবা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণসাগরে খাদ্যশস্য পরিবহনের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেলে ‘খাদ্যসংকট’ দেখা দিতে পারে। এছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়লেও এমন সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যদি এই ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে বাস্তব রূপ নেয়, তবে ২০২৭ সালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ১০৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম মূল পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে, যা ২০২২ সালের দামের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে ৮৭০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা প্রদান করেছে বিশ্বব্যাংক।
আয়হান কোসে বলেন, ‘সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের সুরক্ষা দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ঋণের বড় বোঝা নিয়ে ইতিমধ্যে সমস্যায় থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়াও অগ্রাধিকার হতে হবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। করোনা মহামারির সময়টি বাদ দিলে চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি হবে সবচেয়ে বড় পতন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছর তেলের ব্যবহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। যদি তেলের ব্যবহার কমার এই পূর্বাভাস না থাকত, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেশি বাড়ত। তেলের ব্যবহারের পতনের দিক থেকে এটি হবে তৃতীয় বৃহত্তম পতন; এর আগে বড় পতন দেখা গিয়েছিল ১৯৮০ সালের তেলসংকট এবং করোনা মহামারির সময়ে।