অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট ও বলের অসাধারণ প্রদর্শনের পুরস্কার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দুটি গুরুত্বপূর্ণ র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মার্কো ইয়ানসেন। মাত্র একটি ম্যাচের পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই বিশ্ব ক্রিকেটের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছেন এই প্রোটিয়া তারকা। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করা ভারতের রবীন্দ্র জাদেজাকে সরিয়ে টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায় এক নম্বরে উঠে এসেছেন তিনি। একই সাথে অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ককে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট বোলারের মুকুটও জিতে নিয়েছেন ইয়ানসেন। এর ফলে ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার প্রথমবারের মতো টেস্টের দুটি ভিন্ন বিভাগে একসঙ্গে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পেলেন।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ছেলেদের সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে। আইসিসির এই তালিকায় বোলিং এবং অলরাউন্ডার—উভয় বিভাগেই শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন ইয়ানসেন। গেবেরহায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে তাঁর চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সই এই অভাবনীয় উত্থানের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সিরিজের প্রথম টেস্টে ২১৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে পিছিয়ে পড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিকরা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ইনিংস ও ৩১ রানের বড় জয় তুলে নিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা ফেরায় তারা। এই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন মার্কো ইয়ানসেন।

ব্যাট হাতে দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেন এই বাঁহাতি পেসার। দক্ষিণ আফ্রিকা যখন মাত্র ১১০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ের মুখে, তখন অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার সঙ্গে সপ্তম উইকেটে ১৩২ রানের এক বিশাল জুটি গড়েন তিনি। মাত্র ১০০ বলে ৯টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ৮৫ রান সংগ্রহ করেন ইয়ানসেন। তাঁদের এই জুটির ওপর ভর করে বড় সংগ্রহের ভিত পায় দক্ষিণ আফ্রিকা এবং শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ৪২৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে স্বাগতিকরা।

ব্যাট হাতে সাফল্যের পর বল হাতেও সমান দাপট দেখান ইয়ানসেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে মাত্র ৩৩ রান খরচ করে তুলে নেন পাঁচটি উইকেট। তাঁর বোলিং তোপে সফরকারীরা মাত্র ৯৯ রানেই গুটিয়ে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসেও ৩৪ রানে একটি উইকেট শিকার করেন তিনি। যদিও অস্ট্রেলিয়া এবার ২৯৫ রান তুলতে সক্ষম হয়, তবে ইনিংস ব্যবধানে হার এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের ফলে টেস্ট বোলারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে এক লাফে পাঁচ ধাপ এগিয়ে এসেছেন ইয়ানসেন। ৮৭৬ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে তিনি এখন শীর্ষস্থানে। এর আগে এক নম্বরে থাকা অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক ৮৬১ পয়েন্ট নিয়ে নেমে গেছেন যৌথ দ্বিতীয় স্থানে। একই পয়েন্ট নিয়ে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ম্যাট হেনরি।

বোলিংয়ের পাশাপাশি টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন ইয়ানসেন। এক ধাপ এগিয়ে ৪৫১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে উঠে তিনি রবীন্দ্র জাদেজার দীর্ঘ রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছেন। ভারতীয় এই অলরাউন্ডার চার বছরেরও বেশি সময় ধরে এক নম্বর অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, তবে এখন ৪২২ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছেন তিনি।

এই র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের জন্য সুখবর এসেছে মেহেদী হাসান মিরাজের মাধ্যমে। ৩১৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন মিরাজ। তাঁর ঠিক পরেই ৩০৯ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে দক্ষিণ আফ্রিকার উইয়ান মুল্ডার এবং ২৫৭ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক।

ইয়ানসেনের এই সাফল্য দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কাগিসো রাবাদার পর দেশটির প্রথম বোলার হিসেবে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠেছেন তিনি। এছাড়া টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায় ২০১৪ সালের আগস্টে ভারনন ফিল্যান্ডারের পর প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে এক নম্বর হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ইয়ানসেন।

শুধুমাত্র বোলিং ও অলরাউন্ডার বিভাগেই নয়, ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিংয়েও উন্নতি করেছেন এই প্রোটিয়া ক্রিকেটার। ১৩ ধাপ এগিয়ে টেস্ট ব্যাটারদের তালিকায় ৫৬তম স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। ফলে সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিংয়ে তিন বিভাগেই নিজের অবস্থান উন্নত করেছেন তিনি।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ১৭৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাও বড় সুখবর পেয়েছেন। চার ধাপ এগিয়ে ক্যারিয়ারসেরা দ্বিতীয় স্থানে উঠেছেন তিনি। টেস্ট ব্যাটারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে তাঁর ওপরে এখন কেবল ইংল্যান্ডের হ্যারি ব্রুক।

বাভুমার বর্তমান রেটিং পয়েন্ট ৮১৮। অন্যদিকে ৮৬১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন ব্রুক। ৮১৬ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ইংল্যান্ডের আরেক অভিজ্ঞ ব্যাটার জো রুট।

র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্কট বোল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমন হারমারেরও। বোল্যান্ড তিন ধাপ এগিয়ে টেস্ট বোলারদের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে উঠেছেন। অন্যদিকে ১৫ ধাপ এগিয়ে অলরাউন্ডারদের তালিকায় অষ্টম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন হারমার।