ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহিরের মালিকানাধীন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকটির বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে। একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের নির্ধারিত সীমার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ আইনি ছাড় পাওয়ার পরপরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আজ বুধবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে এই ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শরীফ জহিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান 'অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি' ইউসিবি ব্যাংকের ৮ কোটি ২০ লাখ শেয়ার ক্রয় করবে। পাশাপাশি তাঁরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপর প্রতিষ্ঠান 'জে অ্যান্ড জে ইন্টিমেইটস' ব্যাংকটির আরও ৩ কোটি শেয়ার কিনবে। সব মিলিয়ে এই দুই প্রতিষ্ঠান মোট ১১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে, যা ডিএসই ও সিএসইর মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এই ঘোষণার প্রভাব গতকাল ঢাকার বাজারে পরিলক্ষিত হয়, যেখানে ইউসিবি ব্যাংকের শেয়ারের দাম একদিনেই সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পায়। এদিন কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য ১০ শতাংশ বা ৮০ পয়সা বেড়ে ৯ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। গতকালের বাজারমূল্যের হিসেবে, শরীফ জহিরের প্রতিষ্ঠান দুটি যে পরিমাণ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে, তার মোট মূল্য প্রায় ১০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে শেয়ার ধারণের আইনি সীমাবদ্ধতা শিথিল করার পরপরই শত কোটি টাকার শেয়ার কেনার এই সিদ্ধান্ত এলো।
গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ইউসিবিকে একটি বিশেষ আইনি ছাড় প্রদান করে। এই ছাড়ের ফলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ক(১) ধারাটি ব্যাংকটির জন্য শিথিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ওই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, এককভাবে অথবা অন্যের সঙ্গে যৌথভাবে কোনো ব্যাংকের মোট শেয়ারের ১০ (দশ) শতাংশের বেশি মালিকানা অর্জন করতে পারবে না। ইউসিবিকে এই বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর শরীফ জহিরের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান দুটি বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ঘোষণা দেয়। অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি ও জে অ্যান্ড জে ইন্টিমেইটস মিলে যে শেয়ার কেনার কথা জানিয়েছে, তা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটি জানিয়েছে, আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এই ঘোষণা অনুযায়ী শেয়ার কেনা হবে। এই প্রক্রিয়াটি পাবলিক মার্কেটের পাশাপাশি ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে, যেখানে সাধারণত বড় অঙ্কের শেয়ার লেনদেন হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউসিবি সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ এবং তাঁর ভাই ও স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের হাতে আগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার ছিল। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির বিভিন্ন অনিয়মের সাথে এই পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশ ছেড়ে চলে যান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং অনিয়মের দায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে। ফলে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ ১০ শতাংশে নেমে আসে। এখন শরীফ জহিরের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে শেয়ার কিনলে উদ্যোক্তাদের অংশ পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।
একদিকে উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে নতুন করে শেয়ার কেনা হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে রাইট শেয়ার বা অধিকারমূলক শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের চেষ্টা করছে ইউসিবি। এরই মধ্যে ব্যাংকটি প্রায় সাড়ে ৭৭ কোটি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৭৭৫ কোটি টাকার বেশি মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত রয়েছে।
শেয়ার কেনার এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে শরীফ জহির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটির ভিত্তি মজবুত করতে আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে আগে নিজেরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি একটি ধাপে উন্নীত হলে এরপর দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে নিজেরা বিনিয়োগ করে ব্যাংকটিকে একটি পর্যায়ে না আনলে এই বিনিয়োগ আসবে না। তাই নতুন করে আমরা বিনিয়োগ করছি।”